ইসরাইল-ফিলিস্তিন অগ্নিগর্ভ

আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: অক্টোবর ৯, ২০২৩, ১২:২০ এএম
আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা
  • পশ্চিমাদের উসকানির অবসান চায় অন্যরা
  • শান্তি আলোচনার ২৫ বছরেও মেলেনি সমাধান, ফের সংঘাত
  • ইসরাইলে নিহত ৬০০ ফিলিস্তিনে ৩০০ ছাড়িয়েছে
  • সাধারণ মানুষকে লড়াইয়ে যোগ দেয়ার আহ্বান হামাসের   

সময় যতই গড়াচ্ছে পরিস্থিতির ততই অবনতি হচ্ছে। হামাস ও ইসরাইলি বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াইও অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গাজার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন শহর থেকে নিজেদের নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছে ইসরাইল। ইসরাইলের সামরিক মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি বলেছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় আমাদের লক্ষ্য হলো গাজার আশপাশে বসবাসকারী নাগরিকদের সরিয়ে নেয়া। এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাবস্থার ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইলের মন্ত্রিসভা। এর মাধ্যমে দেশটির সরকার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। 

গতকাল ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অফিস এ তথ্য নিশ্চিত করে। নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরাইলের ওপর যুদ্ধ আরোপ করেছে। এদিকে সাধারণ মানুষকে চলমান লড়াইয়ে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সামরিক শাখা। ইসরাইলি বাহিনী ও হামাস যোদ্ধাদের মধ্যে লড়াই অব্যাহত থাকায় আল-কাসেম ব্রিগেডের মুখপাত্র আবু ওবেদা একটি নতুন বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। এতে তিনি জনগণকে এই যুদ্ধে যোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে পাঁচ হাজারের বেশি রকেট হামলা চালিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এতেই থেমে থাকেনি হামাস যোদ্ধারা। সীমানা প্রাচীর ভেঙে ইসরাইলের অভ্যন্তরেও ঢুকে পড়ে তারা। এরপরই শুরু হয় দুপক্ষের লড়াই। ইসরাইলের মধ্যে বেশকিছু এলাকায় এই লড়াই চলছে। তাছাড়া গাজার বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলাও চালাচ্ছে ইসরাইল। এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনে নিহতের সংখ্যা তিনশ ছাড়িয়েছে। তবে ফিলিস্তিনের পাশাপাশি ইসরাইলেও নিহতের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইসরাইলে নিহতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর সদস্যও রয়েছে।

এদিকে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে সৃষ্ট এই সংঘাতে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ছে পশ্চিমা দেশগুলোও। যদিও চলমান সহিংস এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা হামাস-ইসরাইল সংঘাত অবসানের আহ্বান জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনের পক্ষেই অনেকটা অবস্থান নেয়ার বিষয়টি পরিষ্কার করেছে চীন। এই সংঘাতের অবসানে ইসরাইল-ফিলিস্তিন আলাদা দুই স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলছে চীন। অন্যদিকে ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমাদেশগুলোও অবস্থান নিয়েছে ইসরাইলের পক্ষে। দুই দেশকেই সংযত আচরণের আহ্বান জানিয়েছে তুরস্ক। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান বলেন, ইসরাইলে ঘটে যাওয়া হামলার কারণে উত্তেজনা বেড়ে যেতে পারে— এমন আবেগপ্রবণ পদক্ষেপ থেকে দূরে থাকার জন্য আমরা দুপক্ষকেই আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, তুরস্ক সবসময় আল-আকসা মসজিদের বিরুদ্ধে হওয়া যেকোনো অপচেষ্টার বিরোধিতা করে। চলমান এই যুদ্ধের মধ্যেই ইসরাইলি পর্যটকদের বাসে হামলা করেছে মিসরীয় এক পুলিশ সদস্য। ব্যক্তিগত অস্ত্র ব্যবহার করেই পর্যটকবাহী বাসে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে ওই পুলিশ সদস্য। এতে দুই ইসরাইলি পর্যটক নিহত হয়। তবে ঠিক কি কারণে এই হামলা করে ওই পুলিশ সদস্য তা এখনো জানা যায়নি। 

তবে পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে একেক দেশের একেক মত থাকলেও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, চলমান সশস্ত্র সংঘাতের নিন্দা জানিয়ে দুপক্ষের হামলায় নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনায় দুঃখও প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা ইসরাইল ও ফিলিস্তিন উভয়কেই সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছি এবং উভয় পক্ষের নিরপরাধ প্রাণহানি এড়ানোর জন্য অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাচ্ছি। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি দখলদারিত্ব ও জোরপূর্বক বসতি স্থাপন এ অঞ্চলে শান্তি বয়ে আনবে না বলেও মনে করে বাংলাদেশ। 

মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশ ফিলিস্তিন ও ইসরাইলকে জাতিসংঘের রেজুলেশন নং- ২৪২ ও ৩৩৮ অনুসরণ করে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাশাপাশি বসবাসের সমর্থন করে, যা এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে পারে। সংঘাতে মাত্রাতিরিক্ত ও নির্বিচারে বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। শুধু সংলাপ ও কূটনীতিই ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান ঘটাতে পারে বলে পুনর্ব্যক্ত করে বাংলাদেশ এ লক্ষ্যে কাজ করার জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সংঘাত ও সহিংসতা বৃদ্ধির ফলে কোনো পক্ষই লাভবান হবে না বলেও উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ। একইভাবে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় আরব লিগ গাজায় সামরিক অভিযান দ্রুত বন্ধের দাবি জানিয়েছে। লিগের প্রধান দুপক্ষের সশস্ত্র লড়াইয়ের অবসান চেয়েছেন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি ব্রাজিল বলেছে, সহিংসতা বন্ধে তারা পরিষদের দ্রুত সভা আহ্বান করবে। ইসরাইলের সাধারণ নাগরিকের ওপর ব্যাপকহারে রকেট হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বেলজিয়াম।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট বলছেন, ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামাসের সন্ত্রাসী হামলায় আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে নিন্দা জানাই। এ ধরনের ঘৃণ্য হামলার বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার অধিকার ইসরাইলের আছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা ‘ইসরাইলের ওপর হামাসের এই সন্ত্রাসী হামলার’ নিন্দা জানায়। জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ বলেন, তার দেশ হামাসের হামলার নিন্দা জানায় এবং ইসরাইলের পক্ষে আছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, হামাসের এ হামলা ইসরাইলের দখলদারির বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের আস্থা বাড়াবে। আর সৌদি আরব বলছে, তারা ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে এই সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তি চায়। এই ঘটনা তারা পর্যবেক্ষণ করছে।  

এদিকে ১৯২০ সালে যে সংকটের গোড়াপত্তন সেই সংকট সমাধানেও গত ২৫ বছর ধরে থেমে থেমে চলছে শান্তি আলোচনা। কিন্তু সংঘাতের সমাধান মেলেনি এখনো। সহসাই চলমান এই সংকটের সমাধান মিলবে তাও বলা মুশকিল। কারণ ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিরা বেশকিছু ইস্যুতে মোটেই একমত হতে পারছে না। এর মধ্যে আছে- ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের বিষয়ে কী হবে, পশ্চিম তীরে যেসব ইহুদি বসতি স্থাপন করা হয়েছে সেগুলো থাকবে নাকি সরিয়ে নেয়া হবে, জেরুজালেম নগরী উভয়ের মধ্যে ভাগাভাগি হবে কি না, আর সবচেয়ে জটিল ইস্যু হলো— ইসরাইলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন। 

এই সংকট সমাধানের সর্ব-সামপ্রতিক উদ্যোগটি নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটিকে ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি বলে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা এই উদ্যোগকে নাকচ করে দিয়েছিল একেবারেই একতরফা একটি উদ্যোগ বলে। যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ নিয়ে আসলে কাজ মোটেই এগোয়নি। ভবিষ্যতের যেকোনো শান্তি চুক্তির আগে দুপক্ষকে জটিল সব সমস্যার সমাধানে একমত হতে হবে। সেটি যতদিন না হচ্ছে, দুপক্ষের এই সংঘাত চলতেই থাকবে।