সক্ষমতা ছাড়াই বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়

মো. নাঈমুল হক প্রকাশিত: অক্টোবর ১০, ২০২৩, ১১:০৮ পিএম
সক্ষমতা ছাড়াই বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়
  • দুিই দশকে বেড়েছে ৩৯টি
  • আবাসন সুবিধা পান না ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী 
  • ল্যাব, শিক্ষক ও জনবল সংকট অধিকাংশের 
  • কাঙ্ক্ষিত ব্যয় নির্বাহে অক্ষম ইউজিসি

সব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় দেয়ার ব্যাপারে সরকারের অঙ্গীকার আছে 
—প্রফেসর ড. হাসিনা খান, সদস্য, ইউজিসি

মান নিশ্চিত না করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হলে ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই
—আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক, জাবি

উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ না করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রসারে জোর দিতে হবে
—ড. ছিদ্দিকুর রহমান, সাবেক পরিচালক, আইইআর, ঢাবি

১৯২১ সালে দেশে প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সময় লেগেছে ৩০ বছরেরও বেশি। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ছয়টি। স্বাধীনতা পরবর্তী ৫০ বছরে এ সংখ্যা আটগুণ বেড়েছে। গত দুই দশকে বেড়েছে ৩৯টি। প্রতিনিয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত মান বাড়ছে  না। এরই মাঝে সর্বশেষ নতুন করে আরও ছয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ইউজিসি বলছে, সব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় দেয়ার ব্যাপারে সরকারের অঙ্গীকার আছে। সে জন্য অনুমোদন দেয়া। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মান তৈরি না করে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হলে ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না। উচ্চশিক্ষার সম্প্রসার না করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের দিকে জোর দেয়ার কথা বলছেন শিক্ষাবিদরা। 

জানা যায়, বর্তমানে ৫৭ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পেয়েছে। এর মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ৫১টি। কার্যক্রম চলমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নানা সংকটে জর্জরিত। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো। তিন থেকে পাঁচজন শিক্ষকে চলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ। ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর নেই আবাসন। জনবল সংকটে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যামেস্টি ও ফার্মেসি ল্যাব সংকটসহ রয়েছে নানা সমস্যা।  

ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৭ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৬ শতাংশ। এর মধ্যে শতভাগ আবাসন সুবিধা রয়েছে মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবাসন সুবিধা পান না বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৫ শতাংশ শিক্ষক। কর্মকর্তাদের মধ্যে ৮৩ শতাংশেরই নেই আবাসন সুবিধা। তিন থেকে পাঁচটি বিভাগ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ১০ বিশ্ববিদ্যালয়। সেগুলো হলো— চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়, হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক সংকটের কথা শোনা যায়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে চারজন শিক্ষকের মাধ্যমে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগেই শিক্ষকের সংখ্যা ১-৩ জন। যেমন- কমিউিনিটি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগে একজন শিক্ষক। এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন বিভাগে দুজন। ফুড মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে তিনজন। ফুড টেকনোলজিতে দুজন। হিউম্যান নিউট্রিশন অ্যান্ড ডাইটেটিক্স এ দুজন। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগগুলো শিক্ষক সংকটে রয়েছে। 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সূত্রে জানা যায়, চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে যথাযথ মান নেই। জাতীয় ফার্মেসি কাউন্সিল এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ল্যাব সংকট, ল্যাবের যন্ত্রপাতি অকেজো, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকট পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ বিষয়গুলোর মানোন্নয়নের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো— জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ (বশেমুরবিপ্রবি) এবং পাবনা বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি)। অনুমোদনের তিন থেকে ছয় বছর পার হলেও ১২ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো গড়ে উঠেনি। এখনো অস্থায়ী ও ভাড়া বাসায় চলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস রুম সংকটের বিষয়গুলো পত্রিকায় আসে। এ ব্যাপারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে থাকা ইউজিসির সদস্য হাসিনা খান বলেন, সব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় দেয়ার ব্যাপারে সরকারের অঙ্গীকার আছে। সে জন্য অনুমোদন দেয়া। আমাদের এক্রেডিটেশন বোর্ড আছে। ওনারা যদি মনে করেন অনুমোদন দেয়া প্রয়োজন তাহলে ওনারা অনুমোদন দিতে পারেন। নতুন ছয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছে। অনুমোদনের যৌক্তিকতার বিষয়ে আমার জানা নেই। এ ব্যাপারে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান স্যার বলতে পারবেন। 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতার ব্যাপারে ইউজিসির পূর্ণকালীন এ সদস্য বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবলের প্রবল চাহিদা আছে। জনবল বাড়ানোর ব্যাপারে তাগিদ আছে। সেগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করছি। সবটা হয়তো আমরা দিতে পারব না। নতুন বিভাগ খোলার ব্যাপারে আমাদের কাছে বিভিন্ন আবেদন আসে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সেগুলোর অনুমোদন দিচ্ছি না। মূলত আর্থিক সক্ষমতার মাধ্যমেই আমরা কাজ করে থাকি। অনুমোদনের যৌক্তিকতার ব্যাপারে ইউজিসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলমগীরের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও ওনাকে পাওয়া যায়নি।

উচ্চশিক্ষার সম্প্রসার না করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের দিকে জোর দেয়ার কথা জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের সাবেক পরিচালক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমাদের দেশে এতো বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন নেই। সব শিক্ষার্থীর জন্য নির্দিষ্ট ক্লাস পর্যন্ত কিছু বিষয় পড়বে। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে। বাকিরা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা গ্রহণ করবে। উচ্চশিক্ষার অবাধ সম্প্রসার না চাওয়ার কারণ জানিয়ে এ শিক্ষাবিদ বলেন, আমাদের দেশে কৃষক দরকার, শ্রমিক দরকার, ব্যবসায়ী দরকার, ড্রাইভারসহ বিভিন্ন পেশার লোক দরকার। আমাদের দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি করা দরকার, বিদেশে কাজ করার জন্য দক্ষ শ্রম শক্তি দরকার। 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান তৈরির কথা জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হলে আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা দূর করা হতো। এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নানা সংকট রয়েছে। আমি কয়েকদিন আগে গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি। সেখানে কয়েকটি বিভাগে দেখেছি, তিন-পাঁচজনের বেশি শিক্ষক নেই। যেখানে শিক্ষক নিয়োগের টাকা নেই। ল্যাবরেটরি সম্প্রসারণের অর্থ নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন থাকলেও চলমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আগে সচল করতে হবে। মান তৈরি না করে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হলে ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই।