নান্দনিক রূপে ফিরছে ঢাকা গেট

আব্দুল কাইয়ুম প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২৩, ১২:২৭ এএম
নান্দনিক রূপে ফিরছে ঢাকা গেট
  • প্রকৃত রূপে ফিরিয়ে আনা হবে স্থাপনাটিকে
  • ৪০০ বছরের ঐতিহাসিক স্থাপনা ঢাকা গেট 
  • বর্তমানে গেটের তিনটি অংশ থাকলেও শুরুতে ছিল দুটি অংশ 
  • পুরোনো আদলে সংস্কারকাজ করা হচ্ছে

নতুন প্রজন্ম যেন ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে সেজন্য ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংস্কার জরুরি
—মুনতাসীর মামুন, ইতিহাসবিদ

দীর্ঘদিন অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থাকার পর অবশেষে ঢাকা গেটের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। ৪০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা ঢাকা গেটের সংস্কার কাজ ইতোমধ্যে প্রায় শেষের দিকে। ঢাকা গেটের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেলেও দীর্ঘদিন সংস্কারে হাত দেয়নি কোনো সংস্থা। নতুন করে সাজাতে ভাঙা অংশ মেরামত, নতুন করে রঙ করা ও সৌন্দর্য বর্ধনে কাজ করা হচ্ছে। এ কাজ পরিপূর্ণভাবে শেষ করতে খরচ হবে ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এই পুনঃনির্মাণের মাধ্যমে গেটের প্রকৃত রূপকে ফিরিয়ে আনা হবে। কারণ এই গেটের সাথে জড়িয়ে আছে চার শতকের অনেক ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে আরও নান্দনিক রূপে সংস্কারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বসার জায়গা থাকবে সেখানে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে সংস্কার কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে ডিএসসিসি। 

এর আগে গত ২৪ মে সংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকা গেটের সংস্কারের কাজ পুরোদমে চলছে। গেটটিতে নতুনত্ব আনার জন্য বিভিন্ন নকশা তৈরি করা হচ্ছে। নির্মাণ শ্রমিকরা তাদের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সংস্কার কাজে গেটের অংশগুলো আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে ভেঙে যাওয়া অংশগুলো সংস্কার করা হচ্ছে। সেখানে সেবার মান বাড়াতে দর্শনার্থীদের বসার আসন স্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি একটি নান্দনিক চত্বর করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত গেটটির ৯০ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হয়েছে। এটির সংস্কার কাজ শেষ হলে ঢাকা গেটের ইতিহাস ঐতিহ্য নতুনভাবে ফুটে উঠবে।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে ঢাকার সীমানা চিহ্নিত করতে এবং স্থলপথে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে ‘ঢাকা গেট’ নির্মাণ করেন মীর জুমলা। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাংলার সুবাদার (মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক) ছিলেন মীর জুমলা। বুড়িগঙ্গা নদী হয়ে ঢাকায় প্রবেশে ব্যবহার হতো এ তোরণ। সে সময় এর নাম ছিল ‘মীর জুমলার গেট’। পরে কখনো ‘ময়মনসিংহ গেট’, কখনো ‘ঢাকা গেট’ এবং অনেক পরে নাম হয় ‘রমনা গেট’। রমনায় প্রবেশের জন্য ব্যবহার করা হতো বলে সাধারণ মানুষের কাছে রমনা গেট নামেই পরিচিতি পায়।

ইতিহাসবিদরা বলেন, ঢাকা গেটকে মীর জুমলার গেট বলা হলেও এর সঠিক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে ব্রিটিশ আমলে ম্যাজিস্ট্রেট ডয়লির সময় এই গেট তৈরি করা হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। বর্তমানে গেটের তিনটি অংশ দেখা গেলেও শুরুতে এমনটি ছিল না। প্রথমদিকে রাস্তাটি এক লেনের হওয়ায় গেটের দুটি অংশ ছিল। পাকিস্তান আমলে ৬০-এর দশকে রাস্তাটি দুই লেন করায় এর একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়। তিন নেতার মাজারের অংশটি নতুন করে তৈরি করা হয়। দুই রাস্তার মাঝের পিলারটি সেই ভাঙা অংশেরই একটি অংশ। তারা বলেন, আদি যে চুন-সুরকির প্লাস্টার দিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছিল সেই একই উপকরণ দিয়েই এটি সংস্কার করা দরকার। আদি ডয়লির অংশটা থাকবে, ৬০ দশকের অংশটাও থাকবে। ওসমানী উদ্যান থেকে মীর জুমলার কামানটিও নতুন করে এনে স্থাপন করা হবে।

চার দশকের এই স্থাপনাটি বহু বছর অযত্নে পড়ে থাকায় শেষ চিহ্নটুকুও বিলীন হওয়ার পথে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবহেলিত এই গেটটি পুরোনো রূপে আবার দেখা যাবে। ফিরে পাবে আগের সেই নান্দনিকতা। ঢাকা শহরকে একটি পর্যটকবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে ডিএসসিসি। এরই অংশ হিসেবে ঐতিহাসিক ঢাকা গেটকে নান্দনিকতায় ফেরাতে সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের শিক্ষক স্থপতি ড. আবু সাঈদের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল গেটটির নতুন একটি নকশা তৈরি করেছে। তার নকশার আদলে সংস্কার কাজ করা হচ্ছে।  

ডিএসসিসি সূত্র মতে, ঢাকার মোগল আমলের স্থাপত্য দেখতে বিদেশিরা প্রায়ই আসেন। কিন্তু পুরোনো স্থাপনাগুলোর চিহ্ন নষ্ট হওয়ায় তারা খুঁজে পান না। নগরায়ণের নিচে ধামাচাপা পড়ে ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। ঢাকা গেট ছাড়াও এমন অনেক ঐতিহাসিক স্থাপত্য হারিয়ে যাচ্ছে। আগামী প্রজন্ম যেন ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে তাই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে ডিএসসিসি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ মুনতাসীর উদ্দিন খান মামুন আমার সংবাদকে বলেন, সিটি কর্পোরেশন ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে ঢাকা গেটকে সংস্কারের কাজ করছে। সংস্কারের পাশাপাশি এখানে থাকবে বসার স্থানও। বর্তমান প্রজন্ম যেন ঢাকার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে সেজন্য ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংস্কার জরুরি। অনেকে এটাকে মীর জুমলা গেট বলে থাকেন। তাদের ধারণা এটি মীর জুমলার শাসনামলে নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এই কথার সঠিক কোনো তথ্য বা নিদর্শন পাওয়া যায়নি। মূলত, ১৮৩০ সালে রমনা, রেসকোর্স ও এই অঞ্চলের স্থাপনাগুলো পরিষ্কারের কাজ শুরু করে তখন এটি নির্মাণ করা হয়। ডিএসসিসির এই আগ্রহ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। পুরোনো স্থাপনার গঠন ঠিক রেখে এই সংস্কার কাজ করা হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু ভাঙা অংশটুকু মেরামত করা হচ্ছে। তবে এটা রঙ ঠিক আছে কিনা তা বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন। সবাই যেন ঢাকা গেটের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে সেজন্য এর পাশেই ফলক তৈরি করা হবে।