আজ বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস

অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রকাশিত: নভেম্বর ১৪, ২০২৩, ১২:০১ এএম
অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর
  • অসংক্রামক রোগে মৃত্যুুর ১০ শতাংশ ডায়াবেটিসে
  • দেশে এক কোটি ৩১ লাখ ডায়বেটিস রোগী
  • আক্রান্তের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশ অষ্টম

ফাস্টফুড ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে  যাদের ডায়াবেটিস ঝুঁকি বেশি, তাদের 
৩০ বছর থেকে চেকআপ করা প্রয়োজন 
—অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান, সভাপতি, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি

ডায়াবেটিস রোগের প্রতিকার জানা জরুরি পাশাপাশি আক্রান্তদের জন্য ইনসুলিন সহজলভ্য করতে হবে
—অধ্যাপক ডা. আখতার হোসেন, সভাপতি,  আন্তর্জাতিক ডায়বেটিস ফেডারেশন

ব্যস্ত নগরী তখনও ঘুমের আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেনি। রাজধানীর বলদা গার্ডেনের চারপাশে হাঁটছে ৪৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সি কয়েকজন। তারা সবাই নিয়ম করে এখানে ভোরে এসে এক ঘণ্টা সময় নিয়ে হাঁটেন। তাদের রয়েছে একটি সংঘ। সংঘের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডা. জয়নুদ্দীন চৌধুরী। তার সাথে কথা হয় আমার সংবাদের এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, এখানে হাঁটতে আসা অনেকে ডায়বেটিস রোগে আক্রান্ত। ডায়বেটিস রোগীদের জন্য হাঁটার কোনো বিকল্প নেই। ডায়াবেটিসের মূল সমস্যা হলো ইনসুলিনের অভাব অথবা অকার্যকারিতা। নিয়মিত হাঁটলে শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ে। পেশিকোষে গ্লুকোজ প্রবেশ করার জন্য ইনসুলিনের প্রয়োজন। হাঁটার ফলে পেশিকোষে গ্লুকোজ প্রবেশ সহজ হয়। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নেমে আসে। এ ছাড়া হাঁটার ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে ডায়াবেটিসের জটিলতা কমে। হাঁটলে ঘুমও ভালো হয়, যা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য খুব জরুরি। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার তথ্য বলছে, দেশে প্রায় এক কোটি ৩১ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২০ থেকে ৮০ বছর বয়সি ১৪ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ এই রোগে ভুগছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে অষ্টম। বর্তমান ধারায় চলতে থাকলে ২০৪৫ সালে দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা হবে দুই কোটি ২৩ লাখ। তখন বিশ্বে অবস্থান হবে সপ্তম। অন্যদিকে দেশে ৭০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ বা ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে শুধু ১০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় ডায়াবেটিসে। ডায়বেটিস রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়লেও দেশে ডায়বেটিস চিকিৎসায় সর্বজনীন কোনো নির্দেশিকা ছিল না। সামপ্রতিক সময়ে জাপানি দাতা সংস্থা জাইকার সহায়তায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা দেশে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় সর্বজনগ্রাহ্য নির্দেশিকা তৈরি করে। সংস্থটির পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি চূড়ান্ত কোনো নির্দেশিকা নয়। সময়ের প্রয়োজনে এই নির্দেশিকায় পরিবর্তন ও সংশোধন আসবে। ডায়াবেটিস চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ইনসুলিন। 

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশেই ইনসুলিন সহজলভ্য নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রায় ৯০ লাখ টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগী আছে। ইনসুলিন না পেলে রোগটি তাদের কাছে মৃত্যুর সমান। ইনসুলিন রোগকে ব্যবস্থাপনার পর্যায়ে নিয়ে আসে। অন্যদিকে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস আছে প্রায় ছয় কোটি মানুষের। তাদের কিডনি ও দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখতে ইনসুলিনের বড় ভূমিকা রয়েছে। টাইপ-২ আক্রান্ত প্রতি দুজন রোগীর একজনের ইনসুলিন দরকার হয়, কিন্তু তা তারা পায় না। নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয় ডায়াবেটিসের প্রকোপ বাড়ছে, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ইনসুলিনের ব্যবহার বাড়ছে না।

বাংলাদেশে ডায়াবেটিক রোগের প্রতিকার ও চিকিৎসা নিয়ে বাংলাদেশের ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, ফাস্টফুড ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে। ফাস্টফুডের লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেয়া উচিত নয়। উন্নত দেশে স্কুল-কলেজের আশেপাশে বা বিজ্ঞাপনে ফাস্টফুডের বিজ্ঞাপন দেয়া নিষেধ। সেখানে বাংলাদেশে স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে সব জায়গায় ফাস্টফুড থাকে। এ ছাড়া প্রত্যেকটি খাবারের গায়ে উপাদান সম্পর্কে লেখা থাকতে হবে। এতে মানুষ সচেতন থাকবে তার জন্য কোনটি ক্ষতিকর। 

তিনি বলেন, গ্রামের চেয়ে শহরে ডায়াবেটিস রোগী বেশি। কিন্তু প্রি-ডায়াবেটিস গ্রামে বেশি। তাদেরকে যদি শহরে আনা হয় আর আরামে থাকে তাহলেই তাদের ডায়াবেটিস হবে। ৪০ বছর বয়স থেকে ডায়াবেটিস চেকআপ করা উচিত। আর যাদের ঝুঁকি বেশি তাদের ৩০ বছর থেকে চেকআপ করা প্রয়োজন। ডায়াবেটিক হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের সভাপতি বাংলাদেশি চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আখতার হোসেন বলেন, ইনসুলিন কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়। অথচ যেসব মানুষের ডায়াবেটিস চিকিৎসায় ইনসুলিন প্রয়োজন, তাদের ৫০ শতাংশ তা পান না। আ

ফ্রিকার দেশগুলোতে সাতজনের একজন ইনসুলিন পান। ইনসুলিন সহজপ্রাপ্য না হওয়ার জন্য শুধু ওষুধ কোম্পানিগুলো দায়ী নয়; এর জন্য নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, নাগরিক সংগঠন সবারই দায় আছে। এই ডায়াবেটিস-বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষের ওপর ডায়াবেটিসের ওষুধের গবেষণা হয়নি। ওষুধের সঠিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীভিত্তিক ওষুধের গবেষণা হওয়া দরকার। আমাদের গবেষণায় গুরুত্ব দিতে হবে।’