- ১৮ ডিসেম্বর থেকে ভোট
- পর্যন্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়
- বদলি করা হচ্ছে ৬৫০ পুলিশ
- পাঁচ দিনে ভোটের মাঠে ফিরলেন ২৫৭ প্রার্থী
রিটার্নিং কর্মকর্তা যাদের প্রার্থিতা বাতিল করেছিলেন তাদের মধ্যে যারা আপিল করেছিলেন, তা আজকের মধ্যেই নিষ্পত্তি হয়ে যাচ্ছে। তফসিল অনুযায়ী, ১৮ ডিসেম্বর প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে। এর আগে ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর বৈধ প্রার্থীদের যে কেউ চাইলে স্বেচ্ছায় প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ পাবেন। ১৮ ডিসেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে প্রচার-প্রচারণা। ভোট গ্রহণ ৭ জানুয়ারি। এদিকে এই প্রতীক বরাদ্দের দিন থেকে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের কোনো সভা-সমাবেশ বা অন্য কোনো প্রকার রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি দেয়া হবে না বলে ইসি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে নতুন করে নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। এতে উদ্বেগ প্রকাশ ও নিন্দা জানিয়ে বিএনপি বলছে, গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের অধিকার রুদ্ধ করার এই অশুভ উদ্যোগ বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তুলবে। আর নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে এমন নজির ছিল না। এমন সিদ্ধান্তের আইনগত দিক দেখা দরকার। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানে যাতে কোনো ধরনের বাধা না আসে, সেটি নিশ্চিত করতেই নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) হার্ডলাইনে যেতে হয়েছে। যাতে কোনো কর্মসূচি নির্বাচন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি না করে।
১৮ ডিসেম্বর থেকে ভোট পর্যন্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি নয় : গত ১২ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি নির্দেশনা পাঠায় নির্বাচন কমিশন-ইসি। ইসির উপসচিব আতিয়ার রহমান স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় বলা হয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন ৭ জানুয়ারি ধার্য করা রয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা শুরু হবে। ১৮ ডিসেম্বর থেকে ভোটগ্রহণ সমাপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা ব্যতীত নির্বাচনি কাজে বাধা হতে পারে বা ভোটাররা ভোট দানে নিরুৎসাহিত হতে পারেন এরূপ কোনো প্রকার সভা-সমাবেশ বা অন্য কোনো প্রকার রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা থেকে সবাইকে বিরত রাখা বাঞ্ছনীয়। ইসির ওই নির্দেশনার আলোকে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হাবিবুল হাসানের সই করা ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ১৮ ডিসেম্বর থেকে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের কোনো সভা-সমাবেশ বা অন্য কোনো প্রকার রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি দেয়া হবে না।’ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ১৮ ডিসেম্বর থেকে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা ছাড়া নির্বাচনি কাজে বাধা হতে পারে বা ভোটাররা ভোট দানে নিরুৎসাহিত হতে পারেন এরূপ কোনো প্রকার সভা-সমাবেশ বা অন্য কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা থেকে সবাইকে বিরত রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গণমাধ্যমে এক বিবৃতি পাঠান। ওই বিবৃতিতে দলটির পক্ষ থেকে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ ও বিতর্কিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত নির্বাচন কমিশন সমপ্রতি একটি নজিরবিহীন ও গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচন কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে যেন, ১৮ ডিসেম্বর থেকে জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণের আগ পর্যন্ত ভোটের প্রচার ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি তথা সভা-সমাবেশ আয়োজনের অনুমতি না দেয়া হয়। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি একটি তথাকথিত নির্বাচনের নামে, ভাগবাঁটোয়ারার মাধ্যমে ডামি নির্বাচন আয়োজনের যে অপপ্রয়াস, সেটিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতেই অথর্ব ও অযোগ্য নির্বাচন কমিশন জনবিদ্বেষী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রকারান্তরে এটি আবারও প্রমাণিত হয়েছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর কেন সর্বজনীন অনাস্থা ও বিশ্বাসহীনতা বিরাজমান এবং সর্বাঙ্গীনভাবে পক্ষপাতদুষ্ট এই কমিশনের অধীনে কেন কোনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা ফেয়ার ইলেকশন সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ বলেন, তার জানা মতে, অতীতে কোনো জাতীয় নির্বাচনের আগে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। আমার সংবাদের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘যারা নির্বাচনে নেই, নির্বাচনের সময় তারা কর্মসূচি পালন করার অধিকার হারাতে পারে না। সরকার বা ইসি ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি পালনের সুযোগ দিতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত তারা অহিংস থাকে।’ তিনি বলেন, ‘ইসির এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিএনপিসহ যারা সংক্ষুব্ধ তারা উচ্চ আদালতে যেতে পারে, রিট করতে পারে। তারা চ্যালেঞ্জ করতে পারে, এমন সিদ্ধান্ত কেন বেআইনি হবে না।’
তবে কেউ কেউ বলছেন, কোনো বিশেষ দলকে ঠেকাতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ইসি মূলত চাচ্ছে, তারা নির্বিঘ্নে নির্বাচনি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে। এ ক্ষেত্রে ইসি কোনো প্রতিবন্ধকতা চাচ্ছে না। আর সে কারণেই কর্মসূচির মাধ্যমে বাধা সৃষ্টি হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে ইসিকে হার্ডলাইনে যেতে হয়েছে। এদিকে, সভা-সমাবেশের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে নির্বাচন কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়নি দাবি করে কমিশনার মো. আলমগীর বলেছেন, সরকারের অনুমতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে পারবে। বুধবার সন্ধ্যায় আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে বাধা দেয় এমন সভা-সমাবেশ, আন্দোলন কর্মসূচি যদি থাকে, সেটি যেন করতে না দেয়া হয় সে জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।’
বদলি হচ্ছে ৬৫০ পুলিশ : আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য এসআই, এএসআই, সার্জেন্ট, কনস্টেবলসহ সব মিলিয়ে ৬৫০ পুলিশের বদলি ও পদায়নে সম্মতি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন-ইসি। গতকাল নির্বাচন কমিশনের উপসচিব মিজানুর রহমানের সই করা এক চিঠিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবকে এই সম্মতি জানানো হয়। এর মধ্যে নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক ২৩ জন, টিএসআই একজন, এসআই নিরস্ত্র ১০, এসআই সশস্ত্র ৪৪, এসআই ২০, সার্জেন্ট একজন, নায়েক সাতজন, এএসআই নিরস্ত্র ১৩, পুলিশ কনস্টেবল ৫২৪ ও রাজশাহী রেঞ্জের এসআই নিরস্ত্র সাতজন রয়েছে। এর আগে গত সোমবার দুই পুলিশ কমিশনার, দুই ডিআইজি ও ১০ পুলিশ সুপারকে (এসপি) বদলির প্রস্তাবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আপত্তি নেই বলে এ সংক্রান্ত চিঠি জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো হয়।
পাঁচ দিনে ভোটের মাঠে ফিরলেন ২৫৭ প্রার্থী : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল শুনানিতে পঞ্চম দিনে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ৪৪ জন। নামঞ্জুর হয়েছে ৫২ জনের, সিদ্ধান্ত হয়নি জার প্রার্থীর। এর মধ্য দিয়ে গত পাঁচ দিনে মোট ২৫৭ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। গতকাল আগারগাঁও নির্বাচন কমিশনের আইন শাখা সূত্রে এই তথ্য জানা যায়। ইসি জানায়, প্রথম দিনে ৫৬ জন প্রার্থিতা ফিরে পায়, ৩২ জনের নামঞ্জুর ও ছয়টির সিদ্ধান্ত হয়নি। দ্বিতীয় দিনে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ৫১ জন। নামঞ্জুর হয়েছে ৪১ জনের। তৃতীয় দিনে প্রার্থিতা ফিরে পান ৬১ জন। বাতিল হয়েছে ৩৫ জনের। সিদ্ধান্ত হয়নি চারজনের। আর চতুর্থ দিনে ৪৮ জন তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৫৬১টি আপিল আবেদন জমা পড়েছে। আর ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করবে নির্বাচন কমিশন।
প্রসঙ্গত, গত নভেম্বরের মাঝামাঝি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৭ জানুয়ারি ভোট গ্রহণ হবে। অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে আজ শেষ হচ্ছে আপিল নিষ্পত্তি। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ ডিসেম্বর। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর ১৮ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ হবে। সে ক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র জমার জন্য ১৪ দিন সময় দেয়া হয়েছে এবং প্রচারের জন্য ১৯ দিন সময় রয়েছে। ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রচার শেষ করতে হয়। অর্থাৎ, ১৮ ডিসেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ভোটের প্রচার চালানোর সুযোগ থাকবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন