এনসিটিবির ব্যর্থতার বছর

মো. নাঈমুল হক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২২, ২০২৩, ১১:০৬ পিএম
এনসিটিবির ব্যর্থতার বছর
  • পাঠ্যবইয়ে ভুল, বিতর্ক-সমালোচনা
  • নিম্নমানের বই, হাতে পেতে ছয় মাস পার 
  • নামমাত্র প্রশিক্ষণে নতুন কারিকুলাম শুরু
  • কারিকুলাম নিয়ে অভিভাবকদের অসন্তোষ 
  • মূল্যায়ন অ্যাপস উদ্বোধনেই পার ১০ মাস

উন্নত দেশগুলোর মতো প্রি-প্ল্যান করে কাজ করতে গেলে আমাদের কোনো কাজই হবে না 
—প্রফেসর মো. ফরহাদুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, এনসিটিবি

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দায়িত্ব জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)। দীর্ঘ সময় যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার পর চলতি বছর নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করেছে সরকার। কিন্তু এরপরও বিতর্ক-সমালোচনা পিছু ছাড়ছে না শিক্ষাক্রমের। অভিজ্ঞতানির্ভর শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে প্রতিটি পদেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেনি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এনসিটিবি। বছরের শুরুতেই সমালোচনা-বিতর্ক হয় বই ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিয়ে। নিম্নমানের বই ও পাঠ্যপুস্তকের ভুলের সমালোচনায় পড়তে হয় সংস্থাটিকে। শিক্ষকদের নামমাত্র অনলাইন প্রশিক্ষণে ভুগতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। বিদ্যালয়ে পড়াশোনা না হওয়ার কথা জানিয়েছেন অভিভাবকরা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের অভিযোগ করছেন তারা। বিতর্ক হয়েছে সিলেবাসের বিষয় নিয়ে। বিতর্কের মুখে পাঠ্যপুস্তকের সাড়ে চার শতাধিক সংশোধনী প্রকাশ করে এনসিটিবি। পাঠ্যপুস্তকের কাগজের মান নিয়ে হয়েছে সমালোচনা। বই উৎসবে সব শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছেনি। মাস পার হয়েছে দুই থেকে তিনটি বই নিয়ে। সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বই পৌঁছাতে পার হয়েছে ছয় মাস। মূল্যায়ন কার্যক্রমেও একই অবস্থা সংস্থাটির। শিক্ষাক্রমের পরিবর্তিত মূল্যায়নে অ্যাপস উদ্বোধনে বছরের ১০ মাস পার করেছে এনসিটিবি। যদিও এনসিটিবি কারিকুলাম বাস্তবায়নে নিজেদের সফল মনে করছেন। তবে বিভিন্ন কার্যক্রমের ভুলের ব্যাপারে সংস্থাটির চেয়ারম্যান বলেন, পরিকল্পনা করে কোনো কাজ করতে গেলে ওই কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।  

জানা যায়, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে অভিজ্ঞতানির্ভর শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের পাইলটিং করা হয়। পাঁচ বছরের প্ল্যান ও পরিকল্পনা শেষে এ বছরের জানুয়ারিতে তিন শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের আগে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ২০০ কোটি টাকার বাজেটও প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু চার লাখ ২০ হাজার শিক্ষককে এক ঘণ্টার অনলাইন প্রশিক্ষণ দিয়ে বাস্তবায়ন শুরু হয় নতুন শিক্ষাক্রম। যদিও জানুয়ারিতে কয়েকবার সরাসরি প্রশিক্ষণের কথা শোনা গেলেও পরবর্তীতে সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম না হওয়ার প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের উপর। কী পড়াবেন? কীভাবে পড়াবেন? এ বিষয় বুঝতে বুঝতে বছর পার করেছেন অধিকাংশ শিক্ষক। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নেতিবাচক মানসিকতা। সন্তানদের কোনো পড়াশোনা না হওয়ার অভিযোগ করেছেন অধিকাংশ অভিভাবক। এর মধ্যে সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংসের শঙ্কা থেকে কয়েক দফা আন্দোলনেও নামেন তারা। 

মূল্যায়ন অ্যাপস পেতে ১০ মাস পার : শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে এনে আত্মবিশ্বাসী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে। নাম্বার ভিত্তিক মূল্যায়নের পরিবর্তে ত্রিভূজ, বৃত্ত ও চতুর্ভূজ মূল্যায়নে পদ্ধতি আনা হয়। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হবে বছরব্যাপী। অথচ ৮ নভেম্বরে মূল্যায়নের নৈপুণ্য অ্যাপস উদ্বোধন করা হয়। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন নিয়ে ছিল ধোঁয়াশা। 

পাঠ্যবইয়ে ভুল, বিতর্ক-সমালোচনা : নতুন শিক্ষাক্রমে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই নিয়ে হয়েছে বিতর্ক-সমালোচনা। বিতর্কের মুখে এনসিটিবি সাড়ে চার শতাধিক সংশোধনী দিয়েছে। এরপর পাঠ্যপুস্তকের বিষয় নিয়ে সারা বছর ছিল বিতর্ক। জীবন-জীবিকা, শিল্প ও সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো বই নিয়ে সমালোচনা করেছেন বুদ্ধিজীবীরা। গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষা কমিয়ে এ ধরনের ঐচ্ছিক বিষয়কে প্রাধান্য না দেয়ার পক্ষে তারা। বইয়ের বিষয়গুলোর নিয়েও রক্ষণশীলরা সমালোচনা করেছে। কিশোর বয়সে যৌনতা সম্পর্কিত শিক্ষা যুক্ত না করার পক্ষে তাদের মতো। ডারউইনের বিবর্তন বাদ নিয়ে সমালোচনা করেছেন ইসলামিস্টরা।

নিম্ন মানের বই, হাতে পেতে ছয় মাস পার : প্রতিবারের মতো এবারও বছরের প্রথম দিন সব শিক্ষার্থী বই পায়নি। মুদ্রণ শিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে প্রাথমিকের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এবং মাধ্যমিকের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বই ছাপানোই হয়নি। শিক্ষার্থীরা এবার তাদের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী সব বই হাতে পায়নি। বই উৎসবে পুরো সেটের মাত্র একটি বা দুটি বই দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে  বই দেয়ার সংখ্যা এবং বইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার বইয়ের সরবরাহ না থাকায় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই উৎসবই হয়নি।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. ফরহাদুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, আমরা তৃতীয় বিশ্বের দেশ। উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশের কোনো কাজই প্রি-প্ল্যান অনুযায়ী করা যায় না। আমাদের বাজেটসহ অনেক ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকে। সব কিছু গোছালোভাবে করতে গেলে আমরা যথাযথভাবে কাজ শেষ করতে পারব না। 

এনসিটিবির সফলতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন,  নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে আমরা অনেকাংশে সফল হয়েছি। কিছু সমালোচনা তৈরি হলেও আগামীতে এটি থাকবে না। আমরা ইতোমধ্যে মূল্যায়ন অ্যাপস তৈরি করেছি। এর মাধ্যমে সারা দেশের ইআইএনভুক্ত ও ইআইএন ছাড়া প্রতিষ্ঠানকে আমরা যুক্ত করতে পারব। বইয়ের ব্যাপারে এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, এবার আমরা ইতোমধ্যে প্রাথমিক ও ষষ্ঠ-সপ্তমের বই পাঠিয়েছি। অষ্টম ও নবমের বইয়ের ক্ষেত্রে নতুন কারিকুলামের বই হওয়ায় আমরা কিছুটা পিছিয়ে গেছি। এবার বইয়ের মান ভালো থাকবে।