- পিছিয়ে ছিল না কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা
- টিকটকাররা ঘটায় লোমহর্ষক সব দুর্ঘটনা
চলতি বছর ঢাকাবাসীর জন্য আতঙ্কের নাম ছিল ‘ কিশোর গ্যাংয়ের ছিনতাই’। ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় ছিনতাইয়ের শিকার হতে হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। কেটেছে হাতের কব্জি, বানিয়েছে টিকটক। ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে এক পুলিশ সদস্যও প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে। ২০২৩ সালে সবচেয়ে সমালোচিত ছিল রাজধানী মোহাম্মদপুরের হাতের কব্জি কেটে টিকটক করা কিশোর গ্যাং ‘আনোয়ার ওরফে স্যুটার আনোয়ার গ্রুপ’। মানুষের হাত কেটে গ্যাং সদস্যরা টিকটক ভিডিও তৈরি করত।
গত ৪ অক্টোবর ছিনতাইরত অবস্থায় গ্রুপের অন্যতম লিডার মো. ইউনুছ ও সহযোগী সাইফুল ইসলাম ওরফে ছোট সাইফুল গ্রেপ্তার হয়। র্যাব-২ জানায়, গ্রুপের সদস্যরা নানা অপরাধে জড়িত। দুই কিশোর গ্যাং গ্রুপের অন্তর্দ্বন্দ্বের জেরে এক পক্ষ চাপাতি দিয়ে আরেক পক্ষের হাত বিচ্ছিন্ন করে টিকটক করার মতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটিয়েছিল। এ ছাড়া, তারা ৪০ থেকে ৫০ জন একসঙ্গে এলাকায় জমায়েত হয়ে ছিনতাই-চাঁদাবাজি করত।
এর আগে গত ১ জুলাই রাজধানীর ফার্মগেটে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে মনিরুজ্জামান তালুকদার (৪০) নামে এক পুলিশ কনস্টেবল নিহত হন। এ ছাড়া গত ২৯ জুন রাতে রামপুরায় বিটিভি অফিসের সামনের রাস্তায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে রাকিবুল হাসান রানা (৩০) নামে এক সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। এর আগে ব্রেভ ডেঞ্জার স্ট্রং কিং (বিডিএসকে) গ্যাং দুই বছর ধরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, বেড়িবাঁধ ও ঢাকা উদ্যান এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়েছে। চক্রটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ২০ থেকে ২৫ জন সদস্য।
গত ২৮ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধ, সদরঘাট ও ফরিদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে এ গ্রুপের লিডার হূদয়সহ তার আট সহযোগীকে দেশি-বিদেশি অস্ত্রসহ আটক করেছে র্যাব। বিডিএসকে গ্যাংয়ের লিডার হূদয় ওরফে হিটার হূদয়ের নেতৃত্বে গত দুই বছর আগে গ্যাংটি গঠন করা হয়। এর আগে গ্যাংয়ের সদস্যরা ‘সবুজ বাংলা গ্রুপ’, ‘টপ টেন গ্রুপ’ ও ‘ভাই বন্ধু গ্রুপ’ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব গ্রুপের সদস্যরা স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী হিসেবেও কাজ করত। চলতি বছর আলোচিত এসব ঘটনার পর ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানে নামে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তাদের বিশেষ অভিযানে ৬৭৯ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের হটস্পট রয়েছে প্রায় ৩০টি। বছরজুড়ে এসব এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগ ছিল সবচেয়ে বেশি ছিনতাই-প্রবণ। এ বিভাগের অধীন এলাকাতে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে পুলিশ সদস্য নিহত ও সাংবাদিক আহত হন। মধ্যরাতে ঢাকায় ছিনতাইকারীদের উৎপাত বেশি থাকে। রাত ২টার পর রাজধানীর অধিকাংশ রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। ফলে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে বেশি। তাই মধ্যরাতের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে ডিএমপির সব থানার ওসিদের কড়া নির্দেশনা দিয়েছিলেন কমিশনার।
এদিকে, ঢাকা মহানগরীকে ছিনতাইমুক্ত করে নগরবাসীর চলাচল নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে এবং অপরাধ ভীতি দূর করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয় গত ৭ অক্টোবর। ডিএমপির সাসপেক্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেমের (এসআইভিএস) তথ্যানুযায়ী, রাজধানীতে ছয় হাজারের বেশি মানুষ ছিনতাই ও ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে এক হাজার ৭৩৭ জন ছিনতাই এবং চার হাজার ৪৬১ জন ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িত। এসব অপরাধী বছরজুড়ে ২০০-এর বেশি ছিনতাই ও চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটায়। এসব ঘটনার বাইরেও বহু ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। যেগুলোতে ভুক্তভোগীরা কোনো আইনি সহায়তা নেননি। হটস্পটের তালিকায় রয়েছে শাহবাগ, রমনা, মতিঝিল, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, ভাটারা, শেরেবাংলা নগর, কলাবাগান, রামপুরা, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, উত্তরা পশ্চিম ও পল্লবী এলাকা। এ ছাড়া পান্থপথ, টিএসসি, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল ও তেজগাঁও রেলস্টেশন হলো ছিনতাইয়ের অন্যতম হটস্পট।
চলতি বছরের জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত যখন একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে তখন নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। বিশেষ করে পুলিশ সদস্য হত্যা এবং সাংবাদিক আহত হওয়ার পর ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যায় ডিএমপি। ছিনতাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সব ডিসি ও ওসিদের সঙ্গে আলাদা-আলাদা বৈঠক করেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক। বৈঠকে ডিএমপি কমিশনার সবাইকে নির্দেশ দেন, যেকোনো মূল্যে ছিনতাইকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনার। রাতে পুলিশের টহল বাড়ানোরও নির্দেশ দেন তিনি।
ছিনতাইকারীদের নিয়ে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ঈদের বন্ধে রাজধানীতে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। আমরা ঈদের আগেই অনেক ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছিলাম। এরপরও দুঃখজনকভাবে ঘটনাগুলো ঘটেছে। পুলিশ এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক আছে। ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলছে। রাজধানীকে ছিনতাইকারীমুক্ত না করা পর্যন্ত এ অভিযান চলবে। পত্র-পত্রিকায় দেখেছি, রাজধানীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিনতাই-প্রবণ এলাকা হলো ফার্মগেট। আমরা চাই, নতুন বছরে ফার্মগেটসহ সারা ঢাকায় আর কোনো ছিনতাইয়ের ঘটনা না ঘটে। ছিনতাইকারীদের হামলায় কাউকে যেন মরতে না হয় এটিই আমাদের প্রত্যাশা।
নতুন বছরে নিরাপদ ঢাকা চান মহানগরের বাসিন্দারা। তারা চান, দিন-রাত যেকোনো সময় এ শহরের রাস্তা তাদের জন্য যেন নিরাপদ থাকে। আর কেউ যাতে ছিনতাইয়ের শিকার না হন। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ২০১৭ সালের র্যাব প্রথম কিশোর গ্যাং কালচার চিহ্নিত করে। এরপর এটি দমনে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। পদক্ষেপ নেয়ার পরও তারা এ সমস্ত কার্যক্রম থেকে অনেকে সরে আসছে না। কিশোর গ্যাং কালচারের সাথে জড়িত এক হাজার ১০০ সদস্যকে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছি। সারা বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং দমনে ও এর সাথে যারা জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে যে সব আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন তা নেয়া হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন