দেশে ডলার সংকট ও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বড় চ্যালেঞ্জের কবলে পড়ে জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাত। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গেলো বছর পার করতে হয়েছে তাদের। তবে চলতি বছরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা।
এদিকে ডলার সংকটের কারণে সরবরাহকারীদের বিল পরিশোধ নিয়ে বিপাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিগুলোর (আইপিপি) বিপুল পরিমাণ বকেয়ার চাপে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চলমান এ সংকট নতুন বছরেও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে থাকবে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা পূরণে নানা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এই প্রত্যাশা পূরণে ডলার সংকট বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তারা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় হচ্ছে গ্রীষ্মকাল, রমজান ও সেচ মৌসুম। এই সময়ে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা সবচেয়ে বৃদ্ধি পায়। এ বছর মার্চে রমজান ও সেচ মৌসুম শুরু হবে। সব মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা গত বছরের চেয়ে দেড় হাজার মেগাওয়াট বৃদ্ধি পাবে। এ সময় সম্ভাব্য ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে গ্যাসের চাহিদা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৬০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা ন্যূনতম ১ হাজার ৫৪০ মিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে।
এ ছাড়াও ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ১ লাখ ৫৪ হাজার ৯৫০ টন এবং ডিজেলের চাহিদা ১৫ হাজার ৬০০ টন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে ন্যূনতম দুই মাসের উৎপাদন ক্ষমতা রাখার জন্য জ্বালানি তেলের মজুত নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের কোনো ঘাটতি নেই এবং চাহিদা মোতাবেক সরবরাহ করা হবে। পেট্রোবাংলা বলছে, দিন দিন চাহিদা বাড়ছে, ঘাটতি থাকবেই। ডলার সংকট এ বছর বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, সরবরাহ হচ্ছে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ২১০০ মিলিয়নের মতো, আর আমদানি করা হচ্ছে কমবেশি ৮০০ মিলিয়ন। ডলার সংকটের জন্য প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান অয়েলপ্রাইসডটকমের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৭২ ডলারে ওঠানামা করছে। আর ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ওঠানামা করছে ৭৭ ডলারের মধ্যে। এছাড়া স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রতি মিলিয়ন মেট্রিক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ১১ ডলার ৫২ সেন্টে ওঠানামা করছে। অন্যদিকে কয়লার টনপ্রতি মূল্য ওঠানামা করছে ১১৮ ডলারে। আন্তর্জাতিক বাজারে গত বছর কয়লার টনপ্রতি দাম উঠেছিল ১৮০ ডলারে। এছাড়া অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ ডলার এবং স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএলজির দাম ৩৮ ডলারে উঠেছিল। ফলে জ্বালানির দাম নতুন বছরেও যে অস্থিতিশীল হবে না সে নিশ্চয়তাও কম বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। দেশে ডলার সংকট আবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্য অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় এসব চ্যালেঞ্জ বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
এদিকে সংকট মোকাবিলা করার জন্য দেশের মধ্যে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। ৪৬টি কূপ খননের যে কাজ চলমান রয়েছে সেটির লক্ষ্য বাড়িয়ে ৪৮ করা হয়েছে। ওই প্রকল্পে ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে তাতে সাতটিতে গ্যাস পাওয়া গেছে। এতে ১২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়বে।
সিলেট গ্যাসক্ষেত্রের ১০ নম্বর কূপ খনন করে প্রথম স্তরে তেলের সন্ধান পাওয়া গেছে। পাওয়ার সেল বলছে, চলতি বছর বিদ্যুতের সরবরাহ চাহিদানুয়ায়ী রাখতে নানা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। গ্রাহক স্বস্তিতে থাকবেন। তবে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হবে। অন্যদিকে আবাসিকে গ্যাসের গ্রাহকদের দাম বৃদ্ধির তোড়জোড় শুরু হয়েছে বিইআরসিতে।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন এ বিষয়ে বলেন, নতুন বছরে বিদ্যুৎ খাতে আমাদের দুটি চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থান। দ্বিতীয়ত, এ খাতে জ্বালানি আমদানিতে প্রয়োজনীয় অর্থ ও বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান। গত বছর এসব সংকট থাকা সত্ত্বেও আমরা গ্রাহককে চাহিদামতো বিদ্যুৎ দিয়েছি। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করেছে। এসবের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর অস্বস্তি তো ছিলই। নতুন বছরেও এ খাতে স্বস্তি পাওয়ার মতো কোনো সুযোগ নেই। কারণ সমস্যাগুলো এখনো চলমান। বর্তমানে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে। ফলে আর্থিক জোগানের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ডলার জোগান না থাকলে এ সংশয় আরও বড় হবে।
এদিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। সেই সঙ্গে দুই বিভাগকে দ্রুত ১০০ দিনের প্ল্যান তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল অবদান রাখুন। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও বিদ্যুতের চ্যালেঞ্জ বাড়বে। দক্ষ হাতে ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনের দিনগুলো আরও উন্নত ও ভালো হবে। সম্প্রতি প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস পাইপ লাইন, গ্যাসের মাস্টার প্ল্যান ও ডিপ ড্রিলিংয়ের কাজ জরুরি ভিত্তিতে করা প্রয়োজন। ডাইনামিক প্রাইসিং আসবে। পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন