শয্যা বাড়লেও বাড়েনি সেবা

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৪, ১২:৫৯ এএম
শয্যা বাড়লেও বাড়েনি সেবা
  • ৩০০ বেডের জনবলই নেই, চলছে ৫০০ বেডের হাসপাতাল  
  • অপরিহার্য যন্ত্রপাতির তীব্র সংকট

আমরা সংকটেও সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি  আমরা সব সময়ই আন্তরিক 
—অধ্যাপক ডা. মো. নিজামুল হক, পরিচালক, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

আজ বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘ক্লোজ দ্য কেয়ার গ্যাপ’, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়— ‘আসুন, ক্যান্সার সেবা বৈষম্য দূর করি’। কিন্তু দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালটির বর্তমান যে সংকটময় অবস্থা তাতে ক্যান্সার চিকিৎসায় বৈষম্য কতটা দূর হবে তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সন্দেহ। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীতে হাসপাতালটির বর্তমান অবস্থা ও ক্যান্সার চিকিৎসার হালহকিকত জানতে সরেজমিন ঘুরে রোগী ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় সেবা গ্রহণের সীমাহীন ভোগান্তির কথা। 

মাঘের তীব্র হাড়কাঁপানো শীতের সকালে হাসপাতালের টিকিট কাউন্টারে গতকাল কথা হয় দীর্ঘ লাইনে বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে থাকা আবিদ হোসেনের সঙ্গে। তার বিমর্ষ মুখের কারণ জানতে চাইলে আমার সংবাদকে তিনি বলেন, আমার ১৬ বছরের মেয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে। তিন মাস আগে প্রথমে জ্বর হয়। কয়েকজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখিয়েছি। কিন্তু জ্বর আর ভালো হয় না। এক ডাক্তারের পরামর্শে নিয়ে ক্যান্সার হাসপাতালে আসা। এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। ডাক্তার বলেছেন, এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ক্যান্সার হাসপাতালে চিকিৎসার বিষয়ে তিনি বললে, এখানের চিকিৎসা ভালো। কিন্তু সিরিয়াল দিয়ে ডাক্তারের দেখা পাওয়া রীতিমত যুদ্ধ করা লাগে। রোগী নিয়ে আসলে রোগী দীর্ঘ অপেক্ষায় থেকে আরও দুর্বল হয়ে যায়। এখানে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গেলেও অপেক্ষা করতে হয় বেশ কয়েক দিন। ভোলা থেকে সকালের লঞ্চে স্ত্রীকে নিয়ে ক্যান্সার হাসপাতালে এসেছেন জাবেদ মিয়া। ব্রেস্ট ইউনিটের সামনে তার সাথে কথা হয় আমার সংবাদের। তিনি বলেন, জেলা হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে ঢাকায় আসার জন্য। এখানে এক মাস হলো চিকিৎসা নিচ্ছি। ক্যামোথেরাপি নিতে এখানে অনেক দিন পরপর সিরিয়াল দেয়া হয়। রোগীর সুস্থ হওয়া নিয়ে তিনি শঙ্কিত। 

জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত গত এক সপ্তাহ মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন জারিন সুলতানা। মহিলা ওয়ার্ডের সামনের বারান্দায় বিছানা করে থাকেন তার স্বামী জয়নাল আবেদীন। তার সাথেও কথা হয় আমার সংবাদের। তিনি বলেন, আমাদের যাদের টাকা পয়সা নেই তাদের শেষ ঠিকানা সরকারি হাসপাতালের কমমূল্যের চিকিৎসা। এখানে আসার পর আমার স্ত্রীর কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এখানে রোগীর তুলনায় ডাক্তার ও নার্স অনেক কম। রোগীর অবস্থা হঠাৎ করে খারাপ হলে ডাক্তার ডেকে আনতে অনেক সময় লাগে। এরপর হাসপাতালটিতে ঘুরে দেখা যায়, টিউমার বোর্ড, ড্রেসিং রুম, ব্রেস্ট ইউনিট, এন্ডোস্কোপি, ক্যামোথেরাপি, রেডিওথেরাপিসহ সবগুলো বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ সারি। বহির্বিভাগে দায়িত্বরত একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ৩০০ বেডের হাসপাতাল জনবল ছাড়াই ৫০০ বেডে উন্নতি করা হয়েছে। এখানে পর্যাপ্ত জনবল নেই। রোগী দেখতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় আমাদের। বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী আসে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালে যা হয়, সেখানে করেন বা বাইরে থেকে করে ক্যান্সার হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডকে রিপোর্ট দেন রোগীরা। রিপোর্ট দেখে মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয় সার্জারি হবে নাকি রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি দেয়া হবে নাকি সবগুলোই করা হবে। সার্জারি বা কেমোথেরাপি হলে একটি দিন নির্ধারণ করে দেয় বোর্ড। কিন্তু রেডিওথেরাপি হলেই বোর্ড জানিয়ে দেয় মেশিন স্বল্পতার কারণে এখানে এখন চিকিৎসা দেয়া সম্ভব না, সম্ভাব্য তারিখ দেয়া হয় ছয় থেকে সাত মাস পরের। 

তথ্য রয়েছে, ৫০০ বেডের হাসপাতাল হিসেবে হাসপাতালটিতে জনবল থাকার কথা দুই হাজার ৮৫৮ জন; কিন্তু সেখানে জনবল এক হাজার ১৭৬ জন। যা ৩০০ বেডের জন্যও পর্যাপ্ত নয়। ৫০০ বেডের ক্যান্সার হাসপাতালের স্ট্যান্ডার্ড সেটআপ অনুযায়ী, একটি হাসপাতালের জন্য যেখানে ৩৭ জন অধ্যাপক প্রয়োজন সেখানে ক্যান্সার হাসপাতালে রয়েছেন মাত্র চারজন। একইভাবে ৬১ জন সহযোগী অধ্যাপকের বিপরীতে আছেন ১৩ জন। ১২০ জন সহকারী অধ্যাপকের বিপরীতে আছেন ২৮ জন। ২৩৬ জন মেডিকেল অফিসারের প্রয়োজন থাকলেও কাজ চালাতে হচ্ছে মাত্র ৬৭ জন দিয়ে। হাসপাতালটির চিকিৎসক সংকটই শুধু নয়; ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য রেডিওথেরাপি যন্ত্রের ছয়টির মধ্যে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে চারটি। দুটি রেডিওথেরাপি যন্ত্র কেনা হলেও মেশিনগুলো এখনো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। মাত্র দুটি মেশিন দিয়ে চলছে রেডিওথেরাপি। বাংলাদেশে বছরে কতজন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন বা মারা গেছেন এমন হিসাব সরকারের কাছে নেই। 

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে দেড় লাখ মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে এক লাখ আট হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন। গড়ে প্রতিদিন ২৭০ জনের বেশি মানুষ ক্যান্সারে মারা যান। আক্রান্তের মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার রোগীকে চিকিৎসা সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। সারা দেশে যেখানে প্রায় ১৮ লাখ ক্যান্সার রোগী আছে সেখানে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ৯টি হাসপাতালে। এই ৯টি হাসপাতালের মধ্যে ক্যান্সার হাসপাতাল ছাড়া আর কোথাও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নেই। ফলে এই হাসপাতালের দিকে তাকিয়ে থাকেন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা। আক্রান্তদের মধ্যে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো তারা বেসরকারি হাসপাতাল ও দেশের বাইরে চিকিৎসা করালেও বাকিদের ভরসা কেবল এই ক্যান্সার হাসপাতাল। অথচ বিপুল সংখ্যক অসহায় রোগীদের কথা চিন্তা করে সরকার প্রতিটি মেডিকেল কলেজে ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার ইউনিট করার কাজ চলমান থাকলেও তা চলছে ঢিলেঢালাভাবে।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকটের কথা স্বীকার করে হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নিজামুল হক আমার সংবাদকে বলেন, হাসাপাতালের জনবল চেয়ে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। যন্ত্রপাতির সংকট নিরসনে আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানিয়েছি। আমাদের নতুন কিছু মেশিন রয়েছে। এগুলো খুব শিগগিরই কার্যক্রমে যাবে। দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার হাসপাতাল হওয়াতে সারা দেশের রোগীদের আস্থার জায়গা আমাদের হাসপাতাল। জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট থাকলেও হাসপাতালে কোনো রোগী এসে সেবা ছাড়া যাচ্ছেন না। আমরা সেবা দিতে সব সময়ই আন্তরিক।