শিশুর ক্যান্সার চিকিৎসা

সরকারিতে চিকিৎসা অপ্রতুল

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৪, ০১:২১ এএম
সরকারিতে চিকিৎসা অপ্রতুল
  • বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়বহুল
  • দেশে শিশু ক্যান্সার চিকিৎসার তীব্র সংকট
  • রোগটির চিকিৎসার কাছে মানুষ অসহায়
  • উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পায় মাত্র ২০ শতাংশ শিশু

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্যান্সার চিকিৎসার সঙ্গে শিশুদের চিকিৎসার ভিন্নতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দিতে হবে

—অধ্যাপক ডা. জোহরা জামিলা খান
শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগ ঢামেক
 

শিশুদের মধ্যে জেনেটিক কারণে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্তের হার বেশি। দেশে শিশু ক্যান্সার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়িয়ে সহজলভ্য করতে হবে

—ডা. সৈয়দ হুমায়ুন কবির
সভাপতি, ওয়ার্ল্ড ক্যান্সার সোসাইটি বাংলাদেশ

বসন্তের প্রথম দিন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আঙিনায় পলাশ ফুল ফুটে থাকার দৃশ্য নজর কাড়ছে। একটু সামনে এগিয়ে গেলেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটক। ফটক ধরে সামনে গেলেই মেডিকেল কলেজের পুরাতন ভবনের দ্বিতীয় তলায় শিশু বিভাগ। শিশু বিভাগের বারান্দা থেকে ওয়ার্ড কোথাও রোগী ধারণের তিল পরিমাণ ঠাঁই নেই।

 শিশু ওয়ার্ডের বারান্দায় বিষণ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন জাফর আলী। তার বিষণ্ন মুখের কারণ জানতে তার সাথে কথা বলেন আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক। তিনি বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা দিনাজপুর থেকে তিনি এসেছেন। তার ছয় বছরের ছেলের কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে এক মাস আগে। কিন্তু সে জ্বর আর ভালো হয় না। স্থানীয় পর্যায়ে বেশ কিছুদিন চিকিৎসা করিয়েছেন। পরে এক মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নিয়ে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগে। এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। ডাক্তার বলছেন দীর্ঘ দিন তার চিকিৎসা করালে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় ও ওষুধের খরচ মিলিয়ে তিনি দিশেহারা। এ গল্প শুধু মাত্র জাফর আলীর শিশুর নয়। দেশে  অনেক শিশুই ব্লাড ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। সে তুলনায় দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে শিশুদের ক্যান্সার চিকিৎসা পর্যাপ্ত নয়।

শিশুদের ক্যান্সারের চিকিৎসা হয় মূলত কোনো হাসপাতালের শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগে। হেমাটোলজির আওতায় পড়ে রক্তের ক্যান্সার আর অনকোলজি বলতে বোঝায় হাড়, পেশি, লিভার, কিডনি, ব্রেন ক্যান্সার ইত্যাদি। দেশে বর্তমানে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে ৩৭টি। সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর মধ্যে হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগ রয়েছে ১১টিতে। সেগুলোতে সব মিলিয়ে শিশু ক্যান্সার চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ৬৩ জন।

ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসায় দরকার তিনটি সুবিধা— কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও অস্ত্রোপচার। এ সুবিধাগুলো রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ)। সবগুলো হাসপাতালই ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় মানুষের আস্থার জায়গাও হাসপাতালগুলো ঘিরে। তবে এ হাসপাতালগুলোতেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বেড সংখ্যা, শিশু ক্যান্সার চিকিৎসা সহায়ক যন্ত্রপাতির তীব্র সংকট রয়েছেন। দেশে শিশু ক্যান্সার চিকিৎসার এই সংকটের মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস।

একজন ব্লাড ক্যান্সার বা রক্ত ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুকে সাধারণত দুই থেকে আড়াই বছর চিকিৎসা নিতে হয়। ক্যান্সারের ধরন ভেদে শুধুমাত্র ওষুধের ব্যয় সরকারি হাসপাতালে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। যা বেসরকারি হাসপাতালে সব মিলিয়ে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এ চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার হয়ে যান নিঃস্ব। বাংলাদেশে প্রতিবছর কতজন শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এ নিয়ে ক্যান্সার চিকিৎসা সংশিষ্ট কারো কাছে কোনো সঠিক তথ্য নেই। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন এক হাজারের বেশি শিশুর ক্যান্সার শনাক্ত হয়। উন্নত দেশে ক্যান্সার শনাক্ত শিশুদের ৮০ শতাংশ বেঁচে যায়। আর নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সেটা ২০ শতাংশ। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের তালিকায় আছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশে যেসব শিশু উন্নত চিকিৎসা পাচ্ছেন তার বেশির ভাগই ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে আসেন। দেশে শিশুদের ক্যান্সার আক্রান্তের হার ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক কথা বলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. জোহরা জামিলা খানের সাথে। 

তিনি বলেন, ‘শিশুদের মধ্যে ব্লাড ক্যান্সার বা রক্ত ক্যান্সারে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। রক্তের ক্যান্সার মূলত কেমোথেরাপিতে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু মাংসপেশি, অস্থি বা মস্তিষ্কের ক্যান্সার (যা টিউমার হিসেবে পরিচিত) হলে সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির দরকার হয়। রোগীর তুলনায় শিশু ক্যান্সার চিকিৎসায় দেশে বিভিন্ন ধরনের সংকট রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের ক্যান্সারের সাথে শিশুদের ক্যান্সারের চিকিৎসার ভিন্নতা রয়েছে। আমাদের চিকিৎসকদের মধ্যে অনেকে প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের ক্যান্সার চিকিৎসার মত, ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদেরও একই চিকিৎসা দেন। এতে অনেক সময় শিশুদের ক্যান্সার আরও জটিল হয়। শিশুদের ক্যান্সার চিকিৎসা শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের চিকিৎসকের মাধ্যমেই করাতে হবে।’ দেশে শিশুদের ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা ও চিকিৎসা নিয়ে আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক কথা বলেন ওয়ার্ল্ড ক্যান্সার সোসাইটি বাংলাদেশের সভাপতি ও ক্যান্সার গবেষক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরের সাথে। 

তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ না থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জেনিটিক্যাল কারণ, ভাইরাস, খাবারে টক্সিনের উপস্থিতি, কেমিক্যালসলস, পরিবেশগত সমস্যায় শিশুদের ক্যান্সার হয়। তবে আশার কথা হচ্ছে, প্রাথমিকভাবে এ রোগ শনাক্ত করা গেলে বেশিরভাগ শিশুরই ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শিশুদের ক্যান্সার মোকাবিলায় সবার আগে সচেতনতা বাড়াতে হবে। দেশে শিশুদের ক্যান্সার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়িয়ে সহজলভ্য করতে হবে।’