- পঙ্গু হয়ে বছরে কর্মহীন হচ্ছে ২০ হাজার মানুষ
- চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম দ্বিগুণ হারে বাড়ছে
- পঙ্গুরা সামাজিকভাবে অবহেলার শিকার
দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসা দিতে পারলে পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা করা যায়। পঙ্গুত্ব কমাতে অর্থোপেডিক চিকিৎসার পরিধি আরও বাড়াতে হবে
—অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম উজ্জামান, পরিচালক, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই বছর আগে ডান পা হারান মুন্সীগঞ্জের রহমান আলী। তখন তিনি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দুর্ঘটনায় পা হারানোর পর তিনি আর চাকরিতে ফিরতে পারেননি। পাঁচ সদস্যের পরিবারে স্ত্রীর চাকরির উপর ভর করেই চলছে এখন তার জীবন। পঙ্গুত্বের পাশাপাশি ভুগছেন শারীরিক বিভিন্ন জটিলতায়। এ অবস্থা শুধু রহমান আলীর নয়, বিভিন্ন দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করা বেশির ভাগ মানুষের।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছেই। প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৮০ হাজার মানুষ প্রতিবন্ধী বা পঙ্গু হয়। এর মধ্যে ১২ হাজারের বেশি ১৭ বছরের কম বয়সি শিশু। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ২২০ জন মানুষ প্রতিবন্ধী হচ্ছেন কেবল সড়ক দুর্ঘটনায়। সড়ক দুর্ঘটনা ছাড়া শিশুরা বেশির ভাগ পঙ্গু হচ্ছে ছাদ, গাছ কিংবা অন্যান্য জায়গা থেকে পড়ে। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাসহ অন্যান্য কারণেও পঙ্গু হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে আজ শুক্রবার সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব পঙ্গু দিবস।
বেসরকারি সংস্থা বেনসিসের এক জরিপ বলছে, দেশে পঙ্গুত্ব বরণ করা কর্মজীবী ১০ শতাংশের কম মানুষ কর্ম ফিরে পান। তাদের বেশির ভাগ হয়ে পড়েন কর্মহীন। বছরে পঙ্গু হয়ে কর্মহীন হন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে অবহেলার শিকার হন ৭০ শতাংশের বেশি। পঙ্গুদের জন্য পুনর্বাসন করতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও তা প্রান্তিক পর্যায়ের জন্য যথেষ্ট নয়। দেশে পঙ্গুত্ব বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে পঙ্গু চিকিৎসার ব্যয়। আগারগাঁও এলাকায় অর্থোপেডিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বিক্রি করেন এমন কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা যায়, পায়ের গোড়ালি, পায়ের পাতায় ব্যথায় ব্যবহূত ‘ফুট ড্রপ’ ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে এক হাজার ২০০ টাকা, হাঁটুর টুপি বা নি-ক্যাপের দাম ২১০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪০০ টাকা, হাঁটুর বন্ধনীর দাম এক হাজার ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে দুই হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে। হাঁটার ক্র্যাচ স্টিক তিন মাস আগে বিক্রি হতো ৪০০ টাকায় এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকায়। এমন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ধরনের পঙ্গু চিকিৎসা সরঞ্জাম দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) এশিয়ার সর্ববৃহৎ পঙ্গু চিকিৎসার হাসপাতাল। হাসপাতালটিতে বহির্বিভাগে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী সেবা নিয়ে থাকেন। এক হাজার শয্যার হাসপাতালটিতে গড়ে রোগী ভর্তি থাকেন এক হাজারের বেশি। অর্থোপেডিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা। হাসপাতালটিতে রোগী অনুযায়ী অস্ত্রোপচার ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। হাসপাতালটিতে সেবার মান ও ভোগান্তি নিয়ে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগের শেষ নেই। দেশে পঙ্গু
চিকিৎসার বর্তমান অবস্থা ও ব্যয় নিয়ে আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক কথা বলেন হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম উজ্জামানের সাথে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে হয়। রক্তনালি ছিঁড়ে যাওয়া, হাড় ভাঙা, ওপেন ফ্র্যাকচার ও ইনফেকশনের চিকিৎসায় ছয় ঘণ্টার মধ্যে সেবা দিতে হয়। এতে প্রাণ বাঁচানোসহ পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু ঢাকার বাইরে নিটোরের মতো প্রতিষ্ঠান না থাকায় অধিকাংশ আহত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না। বিশেষায়িত সেবা নিতে ব্যর্থ হন। পঙ্গুত্ব কমাতে আমাদের অর্থোপেডিক চিকিৎসার পরিধি আরও বাড়াতে হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন