- সেপ্টেম্বর শেষে ছিল ৪,৪২,২৭৯ জন
- ডিসেম্বর শেষে ৪,৩১,২২১ জন
- এক বছরে আমানতকারী কমেছে ৯০ হাজার
ব্যাংকগুলো বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করায় সেখানে চলে যাচ্ছে
—আইআইডিএফসির এমডি
কোনোভাবেই গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে পারছে না ঋণ জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মে জড়িত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়া দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। সাধারণ মানুষ এখন আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আগের মতো আমানত রাখতে ভরসা পাচ্ছেন না। তাই ২০২২ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে কমছে আমানতকারীর সংখ্যা। সর্বশেষ ডিসেম্বর-২৩ প্রান্তিকেও ১১ হাজার ৫৮ আমানতকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন আমানত সংগ্রহের চেয়ে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণ জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের কারণে বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব কারণে সাধারণ মানুষও এখন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমানত রাখতে ভয় পান। যার কারণে প্রতি মাসেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীর সংখ্যা কমছে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যেভাবে তদারকি করার দরকার ছিল, সেটাও হচ্ছে না। এখন গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) চেয়ারম্যান ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কোম্পানি (আইআইডিএফসি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, আমানতকারীর সংখ্যা কমবে-বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। বেটার কোথাও পেলে সেখানে যেতে পারে। অন্য কোথাও যেতে পারবে না— এটা তো কোনো কথা নয়। তিনি বলেন, আমানত কমার আরেকটি কারণ হলো ব্যাংকগুলো এখন বেশি সুদে আমানত নিচ্ছে। এজন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কিছু আমানতকারী এখান থেকে গিয়ে ব্যাংকে আমানত রাখছেন।
আমানতকারীরা এভাবে চলে গেলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎৎ কী হবে— এমন প্রশ্নে গোলাম সরওয়ার ভুঁইয়া বলেন, এটা কোনো সমস্যা নয়। আমানতকারীদের ম্যানেজ করতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীর সংখ্যা ছিল চার লাখ ৪২ হাজার ২৭৯ জন। আর ডিসেম্বর শেষে তা দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৩১ হাজার ২২১ জনে। সে হিসাবে তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) আমানতকারীর সংখ্যা কমেছে ১১ হাজার ৫৮ জন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীর সংখ্যা কমেছিল ২৫ হাজার ৭৮২ জন। এর আগের তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) এ সংখ্যা কমেছিল ১৮ হাজার ৪৯৩ জন। এছাড়া ২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এ সংখ্যা কমেছিল ৩৫ হাজার ৫ জন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ডিসেম্বর প্রান্তিকে এসব প্রতিষ্ঠানে আমানত বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ আর ঋণ বিতরণ বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৮৩০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। একই সময়ে তাদের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৭৫৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। সে হিসেবে তিন মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত সংগ্রহের চেয়ে ঋণ বিতরণ বেশি হয়েছে ২৮ হাজার ৯২৯ কোটি এক লাখ টাকা।
আর ২০২৩ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত ছিল ৪৪ হাজার ৭২০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। আর ডিসেম্বর প্রান্তিকে আমানত দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৮৩০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) তাদের আমানত বেড়েছে ১০ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বিতরণের স্থিতি ছিল ৭৩ হাজার ৩৩৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। আর তিন মাস পর (অক্টোবর-ডিসেম্বর) এই স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৭৫৯ কোটি ১৯ লাখ টাকায়। সে হিসেবে তিন মাসে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৪২ হাজার ৭৬ কোটি টাকা।
এদিকে আলোচ্য এই প্রান্তিকে সবেচেয়ে বেশি আমানত কমেছে ময়মনসিংহ বিভাগে। এ বিভাগে ডিসেম্বর শেষে আমানত দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। আর সেপ্টেম্বর শেষে এ বিভাগে আমানত ছিল ১৪ হাজার ৫৯ কোটি টাকা। সে হিসেবে তিন মাসে ময়মনসিংহ বিভাগের আমানত কমেছে পাঁচ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। এরপর কমার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বরিশাল বিভাগ। সেপ্টেম্বর শেষে এ বিভাগে আমানত ছিল পাঁচ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। আর ডিসেম্বর শেষে এ আমানত দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে তিন মাসে বরিশালে আমানত কমেছে ২০৫ কোটি টাকা।
অপরদিকে চট্টগ্রাম বিভাগে আমানত বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ, ঢাকা বিভাগে বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ, খুলনা বিভাগে বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫১ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে বেড়েছে এক দশমিক ৫৮ শতাংশ, সিলেটে বেড়েছে দুই দশমিক ১৩ শতাংশ এবং রংপুর বিভাগে বেড়েছে দুই দশমিক ৩৪ শতাংশ।
আরএস
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন