বেদখল বন উদ্ধারে দৃষ্টান্ত

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৪, ১২:২৭ এএম
বেদখল বন উদ্ধারে দৃষ্টান্ত

অংশীদারিত্বমূলক সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে দরিদ্ররা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন

—অজিত কুমার রুদ্র, সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক, বন অধিদপ্তর

 বেসরকারি সংস্থাসমূহকেও বন সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে

—মো. দানেশ মিয়া, অধ্যাপক, বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সরকারের প্রথম মেয়াদেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদী ও বন রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনা মোতাবেক বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বন অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং কৃত্রিম বনায়ন নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি বনখেকোদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে বনভূমি উদ্ধার ও রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে বন অধিদপ্তর।

এদিকে নতুন বনায়ন সৃষ্টি ও সংরক্ষণে আন্তরিক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীও। সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বিলুপ্তপ্রায় বৃক্ষ সংরক্ষণের বিষয়ে মন্ত্রী বলেছেন, বৃক্ষরোপণ অভিযানের অংশ হিসেবে বিলুপ্তপ্রায় বৃক্ষ সংরক্ষণ ও সমপ্রসারণে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বনাঞ্চল বাড়াতে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, সহব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে বন ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। এর ফলে বন ও বনভূমি অনেক বেশি টেকসই হচ্ছে। এছাড়া মন্ত্রীর নির্দেশনায় বনভূমি উজাড় রোধে জবরদখলকৃত বনভূমি চিহ্নিতপূর্বক উদ্ধার করার পাশাপাশি নতুন বনায়ন করছে বন অধিদপ্তর।

জনসংখ্যার আশঙ্কাজনক বৃদ্ধিতে সবার মৌলিক চাহিদার প্রয়োজনে বাসস্থান, আসবাবপত্র, খাদ্য, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও কল-কারখানা নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। ফলে পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন বৃদ্ধি ও বনজ সম্পদ সংরক্ষণের গুরুত্ব থাকলেও অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন, রাস্তাঘাট নির্মাণ, অনুমতিবিহীন বৃক্ষ কর্তন ও সংরক্ষিত বনায়নের কৃষি জমিতে স্থানান্তর, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়ত বনভূমি হ্রাস পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে বন উজার রোধে, নতুন বনায়নে এবং দখলকৃত বন উদ্ধারে সম্ভাবনার আলো দেখাচ্ছে বন অধিদপ্তর। আধুনিক প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে বন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভিশন নিয়ে বন অধিদপ্তর তার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এছাড়া সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমে প্রান্তিক ভূমিতে সৃজিত বনায়নের সঙ্গে স্থানীয় দুস্থ ও দরিদ্র জনসাধারণ সম্পৃক্ত হয়ে সামাজিক বনায়নের লভ্যাংশ পাচ্ছে। ফলে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী যেমন বনায়ন করে নিজেদের অভাব-অনটন মোকাবিলা করতে পারছে, তেমনি দেশের পরিবেশ রক্ষা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছে। সামাজিক বনায়ন ও সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটছে।

২০১০-২০১১ থেকে ২০২২-২০২৩ পর্যন্ত অংশীদারিত্বমূলক সামাজিক বনায়নের কার্যক্রম ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৭১ হাজার ৫১০ হেক্টর জমি সামাজিক বনায়নের আওতায় এসেছে। আর এই সামাজিক বনায়নে অংশ নিয়ে এক লাখ ৫৮ হাজার ৫২২ জন ৩২১ কোটি টাকারও বেশি লভ্যাংশ পেয়েছে। এ বিষয়ে বন অধিদপ্তরের সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক অজিত কুমার রুদ্র আমার সংবাদকে বলেন, ‘আশির দশক থেকে দেশে সামাজিক বনায়ন শুরু হয়। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বনায়ন করে সেখান থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ প্রদান করা হচ্ছে। এ অর্থ পেয়ে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছে।’ দেশের পার্বত্য অঞ্চলে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি চালু করা যায়নি জানিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলে সামাজিক বনায়নের এই কর্মসূচি সমপ্রসারণ করা সম্ভব হলে এর সুফল সারাদেশ পাবে।’

বন অধিদপ্তর বলছে, কোভিডকালীন সময়ও বন অধিদপ্তর তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বন অধিদপ্তর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সঠিক ও সার্বিক সহযোগিতায় তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন, বন সমপ্রসারণের জন্য সরকারি বনভূমি, পতিত ভূমি, প্রান্তিক ভূমি, অব্যবহূত কৃষি ভূমি ও উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্র থেকে নতুন জেগে ওঠা ভূমিতে বনায়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে বৃক্ষাচ্ছাদন বৃদ্ধি করছে বন অধিদপ্তর।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী সৃজনের পাশাপাশি বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন সংরক্ষণের মাধ্যমে সেখানকার জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও কাজ করে চলেছে বন অধিদপ্তর। এছাড়া বিভিন্ন প্রভাবশালীর দ্বারা জবরদখলকৃত বনভূমিও উদ্ধার করার ক্ষেত্রে অনন্য নজির স্থাপন করেছে বন অধিদপ্তর। বন অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এক বছরেই প্রায় ২৫ হাজার একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বনাঞ্চল সংলগ্ন ৬১৫টি গ্রামের ৪১ হাজার বন নির্ভর পরিবারকে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে বন পুনরুদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বন অধিদপ্তর।

বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ বনাঞ্চল রয়েছে। এর মধ্যে বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ দেশের আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ। আর দেশের আয়তনের ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ জুড়ে রয়েছে সুন্দরবন। প্রাকৃতিক এই ম্যানগ্রোভ বন দেশের পরিবেশ ও ভারসাম্য রক্ষায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেও গত ২২ বছরে সুন্দরবনে ২৪ বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এতে তিলে তিলে নিঃশেষ হচ্ছে বাংলাদেশের ফুসফুস খ্যাত সুন্দরবন। দুই যুগে বারবার আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ১০০ একর বনভূমি। বন বিভাগের তদন্ত অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে মধু সংগ্রহে আসা মৌয়াল ও মাছ ধরতে আসা জেলেদের ফেলে আসা আগুন থেকে। এসব অগ্নিকাণ্ড নির্বাপণেও বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বন অধিদপ্তর। বিভিন্ন সময়ে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় জনসাধারণকে সাথে নিয়ে বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে পড়া এসব অগ্নিকাণ্ড নির্বাপণে কাজ করেছে বন অধিদপ্তর। 

এছাড়া ভবিষ্যতে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা থেকে নিস্তার পেয়ে অত্যাধুনিক ড্রোন পদ্ধতি ব্যবহারের পাশাপাশি ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা হওয়া সুন্দরবনের তিনটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের অন্তর্গত এক লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর বনাঞ্চলকে সমপ্রসারণ করা হয়েছে। যার আয়তন বর্তমানে তিন লাখ হেক্টরের বেশি। বনভূমি রক্ষায় নিয়মিত গবেষণাকর্ম, সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বন অধিদপ্তর। জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভূমিদস্যুদের মাধ্যমে বনাঞ্চলের জমি দখল ও বনের গাছ কেটে বনভূমি উজার করা রোধে জনবল বৃদ্ধি, বন অধিদপ্তরের ক্ষমতায়ন বাড়ানোসহ অসাধু কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা গেলে দ্রুতই দেশের বনভূমি অনেকাংশে বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। 

এ বিষয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বন বিভাগের সহযোগিতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠা পাওয়া বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. দানেশ মিয়া আমার সংবাদকে বলেন, ‘বন সংরক্ষণ ও সুরক্ষার জন্য বন অধিদপ্তরের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। এছাড়া বন অধিদপ্তরের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাসমূহকে বন সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। তাছাড়া বন সুরক্ষা সম্ভব নয়।’