ছাত্রদল জয়ী হলে ছাত্রদের জন্য ভালো হবে। স্বাধীনতা বিরোধীরা নেতৃত্বে এলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপমানিত হবে—হাবিবুর রহমান হাবিব, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা
ডাকসু এখন পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। সেটা আমাদের জাতির গৌরব এবং সফলতার দিক—মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাবেক ভিপি, ডাকসু ও সাবেক সভাপতি, কমিউনিস্ট পার্টি
একাত্তর টেনে এনে ছাত্র শিবিরকে নিয়ে সমালোচনা করা অহেতুক ও অবান্তর বিষয় —মঞ্জুরুল ইসলাম, সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন সবসময়ই কেবল ক্যাম্পাসের নয়, বরং দেশের জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্দেশ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
ইতিহাসে দেখা গেছে, ডাকসুতে উঠে আসা নেতা সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এবারের ডাকসু নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, এমনকি ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সূচনাকেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব দেখা গেছে ডাকসুতে। দেশের অনেক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পথচলার শুরুও ছিল ডাকসু। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ডাকসুকে কেবল ছাত্রসংসদ নয়, জাতীয় রাজনীতির শক্তির ব্যারোমিটার হিসেবেও দাঁড় করিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংসদ নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের পূর্বাভাস হিসেবে কাজ করবে।
সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ২০১৯ সালে। তখন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রভাবে অনেক শিক্ষার্থী ভোট দিতে পারেননি। এরপর দীর্ঘদিন রাজনীতি ও প্রশাসনিক নানা কারণে ভোট হয়নি।
তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রজনতার আন্দোলনের প্রভাবে নতুন নির্বাচন নিয়ে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে, প্রার্থীরাও মাঠে নেমেছেন। প্রধান রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলো ভোটে অংশ নিচ্ছে। বিএনপির ছাত্রদল, জামায়াতের ছাত্রশিবির, ইসলামী আন্দোলনের ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদের ছাত্র অধিকার পরিষদ, বাম জোট এবং নতুন ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংগঠন-বাগছাস ছাড়াও স্বতন্ত্র ভাবেও ডাকসুর ভোটের মাঠে আছে অনেকে।
হেভিওয়েট প্রার্থীদের উপস্থিতি ক্যাম্পাস রাজনীতিকে প্রাণবন্ত করেছে। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা এখনো আছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয়তা নজর কাড়ছে। বড় জাতীয় দলগুলো তাদের প্যানেল নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মধ্য দিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনে তাদের জনপ্রিয়তা যাচাই করার মতো এই প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাজনীতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শক্তি সংযোগ, নীতি, আদর্শ এবং প্রভাবিত ক্ষমতার দিকগুলো এবার স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডাকসু নির্বাচন দেশের জাতীয় নির্বাচনের একটি ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে কাজ করবে।
২০১৯ সালের পর প্রায় ছয় বছর ডাকসু নির্বাচন বন্ধ ছিল। এই বিরতি দেশজুড়ে ছাত্ররাজনীতির নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে পরিবর্তন আনে। সেই প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হওয়া ডাকসু নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রার্থীদের গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা ভোটারদের জন্য গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি হইয়ে দাড়িয়েছে। এবার নির্বাচন অতীতের থেকে আলাদা। ছাত্রলীগ নেই ভোটের মাঠে, ফ্যাসিবাদবিরোধী মিত্রদের মধ্যে লড়াই হবে। সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই প্যানেল ঘোষণা করেছে ও প্রার্থীরা তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।
প্রশাসনিক প্রভাব না থাকায় ভোটাররা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বলে আশাবাদী শিক্ষার্থীরাও। এটি কেবল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ভোট নয়, বরং জাতীয় নির্বাচনের প্রাথমিক আঙ্গিক ও আয়নার মতো কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবারের ডাকসু নির্বাচনে প্রচলিত ছাত্র সংগঠনগুলো ছাড়াও নতুন জোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সক্রিয়।
ডাকসু ঘিরে জুলাই আন্দোলন থেকে উঠে আসা নতুন সংগঠনগুলোও নিজেদের সমর্থন দেখানোর চেষ্টা করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি সমর্থিত বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ ইতোমধ্যেই ক্যাম্পাসে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
যদিও এই সংগঠনের নেতাদের প্যানেলের বাইরেও প্রার্থী হতে দেখা গেছে। জোরেশোরে প্রচারণায় আছে ছাত্রদল, শিবির ও স্বতন্ত্রদের জোটও। প্রচারণায় দেখা গেছে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্রার্থীদেরও।
অন্যদিকে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হওয়া ডাকসুর ভিপি পদে নির্বাচিত হওয়া নুরুল হক নুরের ইমেজকে কাজে লাগিয়ে মাঠে আছে ছাত্র অধিকার পরিষদও।
জাতীয় রাজনীতির বড় দলগুলোর ছাত্র সংগঠনও এই নির্বাচনে নিজেদের শক্তি যাচাই করছে। ফলে ডাকসু নির্বাচন অনেকটা জাতীয় নির্বাচনের “টেস্ট ম্যাচ” হিসেবে দেখা যাচ্ছে। বিজয়ী ছাত্র নেতা বা জোটরা ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলের ভেতরেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচন এবারের জাতীয় রাজনীতি ও আগামী নির্বাচনের জন্য প্রভাবক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এবারের ডাকসু নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক ছাত্রনেতা হাবিবুর রহমান হাবিব আমার সংবাদকে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রদলের যে প্যানেল দিয়েছে,ইনশা-আল্লাহ তারা জয়লাভ করবে। আন্দোলন সংগ্রামে যারা ছিল,তারা ছাত্রদলের পাশাপাশি জয় লাভ করুক সমস্যা নেই। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধীরা যেন জয়লাভ না করে।”
স্বাধীনতাবিরোধীরা ডাকসু নির্বাচনে সক্রিয় হচ্ছে জানিয়ে এক সময়ের প্রভাবশালী এই ছাত্রনেতা আরো বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো স্বাধীনতার ইতিহাস। স্বাধীনতা বিরোধী কোনো শক্তি যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত হতে না পারে,সেটাই চাওয়া। ছাত্রদল দীর্ঘদিন কষ্ট করেছে, ক্যাম্পাসে থাকতে পারে নি,পরীক্ষা দিতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনীতির যে প্রেক্ষাপট, ছাত্রদল জয়ী হলে ছাত্রদের জন্য ভালো হবে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বাম ছাত্র সংগঠন ভালো করুক। কিন্তু এর বাইরে স্বাধীনতা বিরোধীরা নেতৃত্বে এলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপমানিত হবে। সামনে জামায়াত শিবির একাত্তরের ভূমিকায় আসবে। বাংলাদেশ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে।”
তবে ডাকসু ঘিরে একাত্তর কেন্দ্রিক বক্তব্য আওয়ামী লীগের বক্তব্যের সমর্থন করে এবং এগুলো কারো নিজস্ব বক্তব্য হতে পারে না উল্লেখ করে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, এগুলো কারো নিজস্ব বয়ান নয় বলে আমি মনে করি। একাত্তর টেনে এনে ছাত্র শিবিরকে নিয়ে সমালোচনা করা অহেতুক ও অবান্তর বিষয়।
ডাকসু নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের অন্যতম ফ্যাক্টর হবে উল্লেখ করে এই ছাত্রনেতা আমার সংবাদকে বলেন, “ডাকসু নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে। ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে ডাকসু থেকে জাতীয় নেতৃত্ব বের হয়ে আসবে। আগামী নির্বাচনেও এটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে।”
আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে ডাকসু নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মঞ্চ। নতুন জোট বা প্রার্থীরা যদি ভালো করে, তারা তরুণ ভোটারদের সমর্থন অর্জন করতে পারবে। প্রচলিত দলগুলো যদি ব্যর্থ হয়, জাতীয় নির্বাচনে তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। ডাকসুর ফলাফল একটি নির্দেশক হিসেবে কাজ করে, যে দেশের তরুণ ভোটাররা কোনো রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করতে ইচ্ছুক।
স্বাধীনতা উত্তর ডাকসুর ভিপি ও কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “ডাকসু এখন পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। সেটা আমাদের জাতির গৌরব এবং সফলতার দিক। একই সঙ্গে যে কথাটা এখন গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার, আমাদের জাতির প্রগতিশীল অগ্রগতির জন্য এটা দুর্বলতাও বটে। ডাকসু বা ছাত্র সমাজের যে ভূমিকা ছিল,তাকে অতিক্রম করে সচেতন গ্রাম ও শহরের শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সে অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। ছাত্র সমাজের অগ্রণী ভূমিকার কারণে আমরা বড় বড় বিজয় অর্জন করেছি। একই কারণে এই গৌরব ও অর্জনকে আমরা ধরে রাখতে পারি নি। এখনো এ ধরনের আশঙ্কা দৃশ্যমান হচ্ছে।”
অনেক বছর ধরেই ছাত্ররাজনীতি সমালোচনার মুখোমুখি ছিল দলীয়করণ, সহিংসতা, এবং দুর্নীতির অভিযোগের কারণে। তবে এবারের নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হতে যাচ্ছে। আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে ডাকসু নির্বাচন যে বড় ফ্যাক্টর হতে যাচ্ছে তা রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনা থেকে স্পষ্ট। শেষ পর্যন্ত ডাকসুর নেতৃত্বে কারা আসতে যাচ্ছে তার জন্য অপেক্ষা করতে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন