সংঘর্ষে রণক্ষেত্র শাহবাগ

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ প্রকাশিত: আগস্ট ২৭, ২০২৫, ১১:৩৬ পিএম
সংঘর্ষে রণক্ষেত্র শাহবাগ
  • জলকামান-সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, ৮ পুলিশসহ আহত অন্তত ১৫ 
  • সরকারের পর্যালোচনা কমিটি গঠন, শিক্ষার্থীদের প্রত্যাখ্যান
  • মহাসড়ক-রেলপথ অবরোধ, চুয়েটে গায়েবানা জানাজা

রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে শাহবাগ থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল পর্যন্ত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলমসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। 

এর আগে শিক্ষার্থীরা সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের সামনে জমায়েত শুরু করে এবং বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একটি বিশাল মিছিল নিয়ে টিএসসি হয়ে চারুকলা পার হয়ে শাহবাগে পৌঁছায়। তারা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে অবস্থান নেন এবং ‘মার্চ টু ঢাকা’ শিরোনামের কর্মসূচিতে তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন চালান। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে শাহবাগ উত্তাল করে তোলেন। 

একপর্যায়ে তারা প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন ‘যমুনা’ অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বাধা দেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে গেলে পুলিশ লাঠিচার্জ এবং টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। এই সংঘর্ষে আট পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। তাদের রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু আন্দোলনকারীরা আচমকাই যমুনা অভিমুখে ধাওয়া শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাধ্য হয়ে পুলিশকে জলকামান ও অন্যান্য ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়েছে।  

সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে একটি আট সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চারজন উপদেষ্টার নেতৃত্বে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। 

অন্য সদস্যরা হলেন- শিল্প মন্ত্রণালয় ও গৃহায়ন এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। 

এছাড়াও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্সের সভাপতি প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের সভাপতি প্রকৌশলী মো. কবির হোসেন, বাংলাদেশ বোর্ড অব অ্যাক্রেডিটেশন ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. প্রকৌশলী তানভির মঞ্জুর, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী মুহাম্মদ মোজাম্মেল হকও রয়েছেন কমিটিতে। তবে এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থী প্রতিনিধি জুবায়ের আহমেদ বলেন, কমিটিতে আমাদের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় আমরা এটি মেনে নিতে পারি না। আমাদের আগের পেশ করা পাঁচ দফা দাবি দ্রুত মানতে হবে। জানা গেছে, শিক্ষার্থীরা পুলিশের হামলার ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার খরচ বহন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তারা পুনর্ব্যবহারযোগ্য কমিটি গঠন, আগের তিন দফা দাবির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক পদক্ষেপও চান। 

শাহবাগে সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচির অংশ হিসেবে চুয়েট ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে, ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে পুলিশের হামলার প্রতিবাদে গায়েবানা নামাজের আয়োজন করে। কুয়েট শিক্ষার্থীরা ফুলবাড়ীগেট রেলপথ অবরোধ করে যশোর-খুলনা মহাসড়ক বন্ধ রাখে। রুয়েট শিক্ষার্থীরা রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রকাশ করে। 

শাহবাগ ও দেশের অন্যান্য শহরে এই আন্দোলনে একদিকে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক-রেলপথ অবরোধে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি দ্রুত শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান না হলে আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। 

তারা আরও বলছেন, শাহবাগে ঘটে যাওয়া গতকালের সংঘর্ষে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে সংলাপের ঘাটতি, সরকারি পদক্ষেপে দেরি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কৌশলগত ব্যবস্থাপনাতেও ত্রুটি রয়েছে। যে কারণে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— তাদের দাবি এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা, যাতে নাগরিক শান্তি ও চলাচলের স্বাভাবিকতা বজায় থাকে।