চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার রাখার পরিধি বাড়াতে নতুনভাবে চারটি অফডক (বেসরকারি কনটেইনার ডিপো) নতুনভাবে চালু করা হচ্ছে। ফলে বাড়বে বন্দরের কনটেইনার মজুতের পরিমাণ। তাতে কনটেইনার জটের থাবা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরমুক্ত হবে।
বর্তমানে হঠাৎ আমদানি বেড়ে গেলে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের স্তূপ জমে যায়। সেজন্যই বাড়তি কনটেইনারের চাপ কমাতে বন্দরের পক্ষ থেকে দ্রুত ডেলিভারি নিতে অতিরিক্ত মাশুলও নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ১৩ হাজার ৮৭৬ টিইইউএস, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালে আট হাজার ৩৭৬, নিউমুরিং ওভারফ্লো ইয়ার্ডে ছয় হাজার, সাউথ কনটেইনার ইয়ার্ডে তিন হাজার এবং নর্থ কনটেইনার ইয়ার্ডে দুই হাজার ৪৫৮ টিইইউএসসহ ৬টি ইয়ার্ডের ৫৩ হাজার ৫১৮ একক কনটেইনারের ধারণক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বন্দরের অভ্যন্তরে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি চলাচল ও বন্দরের বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট হ্যান্ডলিংয়ের জন্য খালি রাখতে হয় ৩০ শতাংশ জায়গা।
ওই হিসাবে ৩৭ হাজার ৪৬৩ একক কনটেইনার (৫৩৫১৮ এর ৩০ শতাংশ ১৬০৫৫ কনটেইনার) থাকাকে স্বাভাবিক বিবেচনা করা হতো। ইয়ার্ডের ভেতরে কনটেইনারের সংখ্যা তার বেশি হলেই ইয়ার্ড খালি করার জন্য তোড়জোড় করত বন্দর কর্তৃপক্ষ। এখন বন্দরের কনটেইনার রাখার ধারণক্ষমতা ৫৯ হাজার করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিগত ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সাপোর্ট দেয়ার জন্য দেশে অফডকের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে ২১টি অফডকের অনুমোদন থাকলেও ১৯টি অফডক অপারেশন কার্যক্রম চালাচ্ছে। ওই অফডকগুলো এক লাখ ৪ হাজারে ৭০০ একক কনটেইনার ধারণক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু একসময় অফডকগুলো শতভাগ রপ্তানি পণ্যের জাহাজীকরণের কাজ করলেও মাত্র ৩৮টি আইটেমের আমদানি পণ্য রাখার অনুমোদন ছিল। গত বছর ১২টি আইটেমের পণ্য বাড়িয়ে তা ৫০-এ উন্নীত করা হয়।
সম্প্রতি আরও ১৫টি আইটেমের পণ্য বাড়িয়ে বর্তমানে ৬৫ আইটেমের আমদানি পণ্য অফডকে নেয়ার নির্দেশনা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জারি করে। এমনকি সব আমদানি পণ্য দিনে দিনে অফডকে নেয়ারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মূলত আমদানি পণ্যের আইটেম বেড়ে যাওয়ায় অফডকের বাজার বৃদ্ধি পেয়েছে। সেজন্যই নতুন করে আরও চারটি অফডক অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, বন্দরে অফডক যত বাড়বে, বন্দরের ওপর তত চাপ কমবে। তখন বন্দর আরও বেশি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবে। তবে নতুন অফডকগুলোতে খালি কনটেইনার ও আমদানি কনটেইনার রাখার সুযোগ করে দিলে বন্দরের মধ্যে শুধু রপ্তানিমুখী কনটেইনারগুলো থাকবে এবং দ্রুত জাহাজীকরণ করা যাবে। সেক্ষেত্রে অফডকগুলোর ইকুইপমেন্ট থাকতে হবে। যদি পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট না থাকে তাহলে ভোগান্তি আরও বাড়বে। প্রাথমিকভাবে প্রতিটি কনটেইনারে চারটি ট্রেইলার, তিনটি রিচ স্টেকার ও দুটি খালি কনটেইনার হ্যান্ডলার লাগবে। আর সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত জনবল। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩০টি শিপিং কোম্পানির জাহাজ চলাচল করে। ওসব জাহাজ ঘুরেফিরে বন্দরে আসা-যাওয়া করে।
গত মাসে বন্দরে ১১৩টি, মে মাসে ১২৬টি, এপ্রিলে ১২২টি, মার্চে ১১৫টি কনটেইনার জাহাজ ভিড়েছে। ওসব জাহাজ দিয়েই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ হ্যান্ডলিং করে। আর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার কনটেইনার এবং ১৩ কোটি টন কার্গো পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে।
এদিকে অফডক বাড়ানো প্রসঙ্গে বেসরকারি অফডকগুলোর সংগঠন বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার জানান, অফডকের অনুমোদন পাওয়া গেলে নতুন করে কমপক্ষে ২৫ হাজারে একক কনটেইনার রাখা যাবে। প্রথমদিকে রপ্তানি পণ্য রাখার অনুমোদন না দিলেও খালি কনটেইনার ও আমদানি কনটেইনার রাখার অনুমোদন দিলেও বন্দরের ভেতরে কনটেইনারের চাপ কমে যাবে।
বর্তমানে যে চারটি অফডক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে সেগুলো হচ্ছে এ কে খান মোড়ে ৩০ একর জায়গায় এ কে খান কনটেইনার ডিপো, পোর্ট একসেস রোডের পাশে ২৫ একর জায়গায় ইস্টার্ন লজিস্টিকস, পতেঙ্গা বিমানবন্দরের পাশে ১০ একর জায়গায় শাহ মজিদিয়া রহমানিয়া এবং বাড়বকুণ্ডে ২৪ একর জায়গায় বে লিংক কনটেইনার ডিপো।
এদিকে এ ব্যাপারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রথম সেক্রেটারি মোহাম্মদ নাজিউর রহমান মিয়া জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পলিসি হলো বন্দরকে গতিশীল করা। আর বন্দরকে গতিশীল করতে হলে অফডকের সংখ্যা বাড়ানো এবং বন্দরের ভেতর থেকে কনটেইনার সরিয়ে নেয়া প্রয়োজন। ইতোমধ্যে ৬৫ আইটেমের আমদানি পণ্য অফডকে নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এখন নতুন করে আবেদন করা অফডকগুলো নিয়ে পরিদর্শন রিপোর্ট দেয়ার জন্য চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজকে বলা হবে। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে তা পর্যালোচনা করে আবারো পরিদর্শনের পর অনুমোদন দেয়া হবে।
বন্দরে কনটেইনারের জায়গা বাড়ানো প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক জানান, বন্দরের ভেতরে এক্স, ওয়াই শেড এবং অন্যান্য খালি জায়গাগুলোতে কনটেইনার রাখার উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। তাতে বন্দরের ভেতরে কনটেইনার রাখার জায়গা ৫৯ হাজার টিইইউএস কনটেইনারে উন্নীত হয়েছে। আগামীতে ধারণক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন