বৃষ্টি হলেও কেন গরম কাটছে না?  দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

রুহেল হাশেমী শুভ প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৫, ১২:০৬ এএম
বৃষ্টি হলেও কেন গরম কাটছে না?  দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে একটি সাধারণ অভিযোগ হচ্ছে— “বৃষ্টি হচ্ছে প্রচুর, কিন্তু গরম কেটে যাচ্ছে না।” মুষলধারে বৃষ্টি, বজ্রসহ বৃষ্টিপাত, দিনভর আর্দ্রতা, রাতের ঘুম বিঘ্নিত— এসব ঘটনা যেন নিয়ম হয়ে গেছে। মানুষের স্মৃতিতে থাকা “শীতের কাঁথার অনুভূতি আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।

আগের সময় বৃষ্টি পড়লে পরিবেশ শীতল হতো, কাশফুলের গন্ধ, কুয়াশা, শুকনো হাওয়া অনুভব করা যেত, কিন্তু এখন সেই পরিবর্তন পাওয়া যায় কমই। এর কারণ কি শুধু ঋতু পরিবর্তন? নাকি তার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে- জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও অন্যান্য? নিচে বিশ্লেষণ করা হলো— কেন “বৃষ্টি হলেও গরম কাটছে না” এবং এর সঙ্গে যুক্ত কারণ-প্রভাব। 

বাংলাদেশে প্রচলিত আছে ছয়টি ঋতু: গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। গ্রীষ্মপূর্ব; তবে সাধারণের চোখে দুই-তিনটি ঋতু ছাড়া বাকিগুলো আগের মতো তেমন স্পষ্ট অনুভবযোগ্য নয়। বিশেষ করে, গ্রীষ্ম ও বর্ষার সময়কাল দীর্ঘ হয়েছে, রাস্তার ধুলোমাখা গরম দিনের পরিবর্তে আর্দ্র দিন, রাতে হঠাৎ বৃষ্টি, বইছে গরম হাওয়া- এসব মিলিয়ে হয়তো মনে হচ্ছে- “গরম আর চলে যাচ্ছে না”।

ঋতু পরিবর্তন হয় মৌসুমি পশ্চিমবায়ু, বায়ুর গতিবিধি, বর্ষার সময়, হাওয়া ও বাতাসের আর্দ্রতা পরিবর্তন- যা স্বাভাবিকভাবে ঘটে। তবে গত কয়েক দশকে যে পরিবর্তনগুলো হয়েছে, তা স্বাভাবিক ঋতু পরিবর্তনের বাইরেও একটি বৃহৎ প্রাথমিক পরিবর্তনের অংশ। যা সাধারণত “জলবায়ু পরিবর্তন” নামে পরিচিত। 

জলবায়ু পরিবর্তন বলতে বোঝায়— পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাতাস, ভূমি, জলাশয়, মহাসাগর, বরফক্ষেত্র- এসবের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাতের ধরন, মৌসুমের শুরু-শেষের সময়, প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত ও বন্যার প্রবণতা, খরা ও তাপের প্রচণ্ডতা- এসবের পরিবর্তন। ফলে পুরাতন ঋতু চক্র, যা বহু প্রজন্ম ধরে মানুষ দেখে আছে, তা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। 

বাংলাদেশ একটি “দ্রুত পরিবর্তিত জলবায়ু” অঞ্চলে আছে এখানে: গড় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। দীর্ঘ-মেয়াদে দিনের ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য (Tmax I Tmin) উভয়ই বাড়ছে।  আর্দ্রতা (relative humidity) বাড়ছে, যার ফলে শরীরের তাপ শোষণ ও তাপ নিকাশনা কম কার্যকর হচ্ছে। বৃষ্টির পর ও রাতের সময় হিমাগ্রতা পাওয়া যায় কম।  বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন হচ্ছে-  কখনো দীর্ঘ মুষলধারার বৃষ্টি, কখনো মাঝারি-বড় বৃষ্টিপাত; মাঝে মাঝে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রসহ ঝড়। এর ফলে বৃষ্টির পরে মাটি, রাস্তা ও পরিবেশের আরও গরম অনুভূত হয়।

শহরায়ন, জমি পাকা কাঠামো, রাস্তা ও অপ্রচুর গাছপালা - সবই “উর্বান হিট আইল্যান্ড” (Urban Heat Island) তৈরি করে। এতে রাতের হাওয়া কম শীতল হয়, বাতাস বেশি আটকে থাকে এবং গরম বেশি অনুভূত হয়।  

১. আর্দ্রতা ও তাপের সংমিশ্রণ বৃষ্টির পরে বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ে। যদি তাপমাত্রাও বেশি থাকে, তখন “আর্দ্র তাপ” (humid heat) তৈরি হয়, যাকে মানুষ ঠান্ডা অনুভব করতে পারে না-  ঘামিয়ে অনেক বেশি উত্তাপ অনুভব হয়, কারণ ঘাম দ্রুত শুকায় না। 

২. বৃষ্টির ধরন ও সময়— হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি হয়, কিন্তু তা থেমে গেলে পরে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়, রাস্তা-বাতাস গরম থাকে। বা রাতের মধ্যে বৃষ্টি হলেও মেঘ থাকে, যা রেডিয়েশন (রাতে তাপের বিকিরণ) কমিয়ে দেয়— ফলে রাতেও তাপ কম হয় না। 

৩. জলাশয় ও ভূমির অবস্থার পরিবর্তন— যেসব জায়গায় ছিল খোলা মাঠ, ঘাসের মেঠো পথ, জলাশয়, পুকুর, বিল তা অনেকটাই কমে এসেছে, রয়েছ শহরের বিল্ডিং, রাস্তা ও পাকা কাঠামো। এসব পাকা ও কঠিন পৃষ্ঠ তাপ শোষণ করে, ধীরে ধীরে বিকিরণ করে আটকে রাখে। 

৪. নগরায়ন ও গাছপালার হার কমে যাওয়া। গাছপালা- বিশেষ করে ছায়া দেয়ার গাছ, উদ্ভিদপাতা উষ্ণতা ও হালকা বাতাস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নগরায়নের ফলে গাছপালা কমে গেছে, সবুজ জায়গা কম হয়েছে, যা “গরম ধরে রাখার” প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। 

৫. বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন ও বায়ু গতি কমে যাওয়া, পুরানো দিনগুলোতে সকালে হালকা হাওয়ার বইত, বিকালে হাওয়া থাকাত-  যা পরিবেশে শীতল অনুভূতি দিত। এখন গরমকালে হাওয়া থাকে কম, বিকাল-রাতেও বাতাস চাপা হয়, মেঘ থাকে, বৃষ্টির পরও গরম অনুভূত, সূর্যের আলো কমই আছড়ে পড়ে - এমনকি রাতেও তাপ কমে না।

এগুলো শুধুই অনুভূতি নয়; মানুষের অভ্যস্ত স্মৃতি, লোকগল্প ও পারিবারিক অভিজ্ঞতা- তখন যেমন গ্রীষ্মের শেষে বর্ষার শুরুতে সকাল-বিকাল শীতল হাওয়া, সন্ধ্যার হাওয়ার খটখটে স্পর্শ, অজস্র কাদা-মাটি, রাতের কুয়াশা ও ছোট ছোট শীতল স্পর্শ; এসব মিলতো। আজ সেই অনুভূতি কম। কিছু কারণ: পূর্বের মতো সার্বিক পরিবেশ, ঘাসের মাঠ, খোলা জলাশয়, কম নগরায়ন ছিল, আজ অনেক পাকা রাস্তা, পাকা বাড়ি ও কম গাছপালা। বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে (ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনার) ঘরের তাপ কম মনে হলেও বাইরে তাপ অনুভব কম হয় না, কারণ আশপাশ থেকে তাপ এসে পড়ে।

বায়ুমণ্ডলের মৌলিক পরিবর্তন - গড় তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টিপাত অনিশ্চিত হচ্ছে, মৌসুমি সময় সরল-সাজানো আর নয়; বর্ষা কখন শুরু হবে, কখন ভারী হবে; কখন বৃষ্টির পর ধুলো-বাদল হবে- সবই পরিবর্তন হচ্ছে।

ঋতু পরিবর্তন মূলত বছরের নির্দিষ্ট ঋতুগুলোর আসা-যাওয়া ও মৌসুমের বৈশিষ্ট্যের স্থানান্তর- যেমন বর্ষা একটু দেরিতে শুরু করা, শীত একটু কম সময় ধরে থাকা, গ্রীষ্ম বেশি দীর্ঘ হওয়া ইত্যাদি। জলবায়ু পরিবর্তন হলে তাপমাত্রার সাধারণ বৃদ্ধির ধারা, মৌসুমের পরিবর্তনগুলোর অনিশ্চিত, তাপ ও আর্দ্রতার সংমিশ্রণে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি, বন্যা/খরা/অতিবর্ষার পরিবর্তিত ধরন ইত্য‌াদি।

বাংলাদেশে এই দুই ঘটনারই মিল রয়েছে: ঋতুর শুরু-শেষ পরিবর্তন, তবে তাপমাত্রা-আর্দ্রতার ধারা দ্রুত বদলাচ্ছে, ফলে “গরম কাটার ঋতু” যেমন শীতের এমনকি বর্ষার রূপক অনুভূতিও বদলাচ্ছে। স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: গরম ও আর্দ্রতার সংমিশ্রণে মানুষ বেশি ক্লান্ত হয়, ঘুম ভালো হয় না, গ্রীষ্মে রাতে ঘুম ধরতে সমস্যা, ঘাম ও তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। 

আর্থ-সামাজিক প্রভাব: শ্রমিকরা, গার্মেন্টস, নির্মাণ ও বাইরে কাজ করা মানুষ পাশের তুলনায় হঠাৎ সুইটার বা কুয়াশার মতো পরিবেশ কম অনুভব করছে। খোলা দোকান, সড়ক-পথ, বাজার স্বাভাবিক কাজ হয় কঠিন। অনুভূতির থাকছে  বৃদ্ধরা বলছেন, “আগে শীত শুরু হতো”, “রাতের বেলা হালকা জামা-কিন্তু ভালো লাগা হতো”, তবে আজ “রাতেও ঘাম” অনুভব হয় । এই পরিবর্তন যদি রোধ করা না হয় বা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না নেয়া হয়, তাহলে: তাপমাত্রা আরও বাড়বে, গরমের সময়কাল আরও দীর্ঘ হবে। বৃষ্টি হবে, কিন্তু তার তাপমাত্রা ও গড়িয়ে পড়ার ধরন- এমন হবে যেন শীতল অনুভূতি না দেয়- যেমন বৃষ্টি শেষে মেঘ ও বাতাসের চলাচল কম থাকা ইত্যাদি। শহরগুলোর “হিট আইল্যান্ড” প্রতিক্রিয়া আরও বাড়বে এবং নিকট-উপশম কম হবে।

সম্ভাব্য সমাধান ও প্রস্তুতি

১. নগরায়ন পরিকল্পনায় সবুজায়ন বাড়ানো- সড়কের ধারে, বাড়িতে, পার্ক ও খোলা জায়গায় গাছ লাগানো, পার্ক ও জলাশয়ের সংরক্ষণ।

২. ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্নয়ন- রাস্তাঘাট, বাড়ি, ছাদ, জানালা এমনভাবে তৈরি করা যেন তাপ কম শোষিত হয়, ছায়াপাত ও বায়ু চলাচল হয়। 

৩. জলবায়ু অভিযোজন ও পরিকল্পনা- সরকারের উদ্যোগে ‘হিট ওয়েভ রেসপন্স প্ল্যান’, জনসচেতনতা বাড়ানো, রক্ষণাবেক্ষণ ও সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরি করা। 

৪. গবেষণা ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস উন্নয়ন- কখন বৃষ্টি হবে, কতটা প্রবল হবে, তার পূর্বাভাস উন্নত হলে মানুষ প্রস্তুত থাকতে পারবে।

৫. ব্যক্তিগত সচেতনতা- হালকা পোশাক পরা, প্রচুর পানি নেয়া, সন্ধ্যা-বেলা বাইরে কম থাকা, ঘরের ভেন্টিলেশন ভালো রাখা ইত্যাদি। 

বাংলাদেশ আজ এমন একটি সময় পার করছে যেখান থেকে পুরাতন “শীতের কাটা”, “বর্ষার শীতল হাওয়া”, “রাতের খোলা জানালা থেকে আসা হাওয়ায় জাড়া লাগা” এসব অনুভূতিগুলো স্মৃতি হয়ে আসছে। বৃষ্টি হয়েছে- ভালোই হয়েছে- কিন্তু গরম কেটে যাচ্ছে না, কারণ প্রকৃত পরিবর্তন হচ্ছে শুধু ঋতুর সময় বা বৃষ্টিপাতের মাত্রাতেই নয়, পুরো জলবায়ু ও আশপাশের পরিবেশ ও মানুষে পরিবর্তনের। এই পরিবর্তন রোধ করা কঠিন- কারণ বিষয়টি বৈশ্বিক মাত্রায় চলছে।

তবে যত দ্রুত সচেতন হওয়া যায়, পরিকল্পনা চালু করা যায়- নগরায়ন ও বনাঞ্চল রক্ষা, জলের ব্যবস্থাপনা, তাপ প্রসারণ কমানো, সবুজায়ন বাড়ানো- ততই এই “নতুন গরম” কম অনুভূত হবে। 

মানুষের স্মৃতি, অভ্যাস ও আরাম সবই গুরুত্বপূর্ণ  কিন্তু প্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনকে অবজ্ঞা করলে অভ্যেস আর স্মৃতি কিছুই কাজে আসবে না। আমাদের সময় এসেছে পার্থক্য অনুধাবন করার, অভিযোজন করার এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার।