আসন পুনর্বিন্যাসে সহিংস ভাঙ্গা

ফরিদপুর প্রতিনিধি প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৫, ১২:০৬ এএম
আসন পুনর্বিন্যাসে সহিংস ভাঙ্গা
  • স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার হুঁশিয়ারিতে বিক্ষুব্ধ জনতা
  • উপজেলা কার্যালয়, থানা ও যানবাহনে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ
  • ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় মসজিদে আশ্রয় নেয় পুলিশ 
  • অবরোধে স্থবির হয়ে পড়েছে দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলা
  • নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত প্রতিবেদন দেবে জেলা প্রশাসন

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস নিয়ে সহিংসতার ছাপ পড়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা উপজেলা পরিষদ, থানা, নির্বাচন অফিস ও সরকারি দপ্তরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়।

পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মুখে দায়িত্বরত কয়েকজন সদস্য ভাঙ্গা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মসজিদে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সহিংসতার পর গতকাল রাত ৯টায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সময়ে পরিবেশ শান্ত হলেও মহাসড়কে অবরোধ চলমান রয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত রোববার আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর (অব.) হুঁশিয়ারি উচ্চারণের পরদিনই গতকাল সোমবার পরিস্থিতি উত্তপ্ত ও সহিংস হয়ে উঠে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছিলেন, যদি আজকের মধ্যে অবরোধ না তুলে নেয়া হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধ্য হয়ে আইন প্রয়োগ করবে। রাস্তা অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা কোনো অবস্থাতেই বরদাশত করা হবে না। তার এই সতর্কবার্তার পরই কার্যত ভাঙ্গার পরিস্থিতি সহিংস আকার ধারণ করে। 

স্থানীয় সূত্র জানায়, সকালে পূর্বঘোষিত অবরোধ কর্মসূচি এবং প্রশাসনের সতর্কতার মধ্যেও দুপুর নাগাদ জনতা হঠাৎ সড়কে নেমে আসে। মাইকের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে তারা ভাঙ্গা গোলচত্বরসহ বিভিন্ন মহাসড়ক অবরোধ করে। দ্রুতই ছয়টি প্রধান মহাসড়কে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মহাসড়ক ছেড়ে আন্দোলনকারীরা প্রথমে উপজেলা পরিষদের হল রুমে ঢুকে শতাধিক চেয়ার, ১০টি ফ্যান ও ৩৫টির বেশি লাইট ভাঙচুর করে। এরপর তিনতলা বিশিষ্ট উপজেলা পরিষদ ভবনের প্রতিটি তলায় সাতটি করে মোট ২১টি কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয় এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষের কাচ ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়।

এ সময় উপজেলা পরিষদ চত্বর ও অফিসার্স ক্লাবের গ্যারেজে থাকা সাতটি মোটরসাইকেল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এছাড়া উপজেলা অফিসার্স ক্লাবও ভাঙচুর করা হয়। এ সময় ভাঙ্গা থানায়ও হামলা চালিয়ে পুলিশের তিনটি গাড়ি ও একটি বড় রিজার্ভ ভ্যান ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। থানা চত্বরে থাকা অন্তত চারটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়া হয়। থানার ব্যানার ও ভবনের কাচসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর করা হয়। 

অপরদিকে, ভাঙ্গা হাইওয়ে থানায় আন্দোলনকারীরা ব্যাপক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে। আন্দোলনকারীরা চারটি পিক-আপ, একটি রেকার, একটি জলকামান গাড়ি, আটটি মোটরসাইকেল, একটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুটি আলামতের গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। 

ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রোকিবুজ্জামান বলেন, হামলা-ভাঙচুরের সময় কয়েকজন কনস্টেবলকে কৌশলে থানা থেকে বের করে দেয়া হয়। আর আমরা কয়েকজন থানার রান্না ঘরের পাশে একটি বাথরুমে আশ্রয় নেই। হামলাকারীরা গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ অফিসের ল্যাপটপ, টিভি থেকে শুরু করে এমন কোথাও নেই যে ভাঙচুর করতে বাকি রেখেছে। তারপরও বিস্তারিত দেখে পরবর্তীতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের তথ্য জানানো যাবে।

হামলার এ ঘটনায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কসহ দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার সড়ক যোগাযোগ স্থবির হয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ আটকা পড়ে, জরুরি সেবা এবং অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। 

স্থানীয় সূত্র জানায়, অবরোধকারীরা হামলায় ইটপাটকেল, লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং দৌড়ে পার্শ্ববর্তী মসজিদে প্রবেশ করেন। অন্তত ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য ভাঙ্গা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মসজিদে আশ্রয় নেন। বিক্ষুব্ধ জনতা মসজিদের ভেতরও হামলার চেষ্টা চালায়, তবে স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পুলিশকে রক্ষা করেন।

এদিকে অবরোধ চলাকালে বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে রাখা, টায়ারে আগুন জ্বালানো এবং রাস্তায় গাছ কেটে রাখা হয়। এতে দক্ষিণাঞ্চলগামী ও ঢাকামুখী যানবাহন আটকা পড়ে। সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ী সবাই দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় দুর্ভোগে পড়েন। জরুরি সেবা, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সও সীমাহীন বিঘ্নের শিকার হয়।

এর আগে গত ৪ আগস্ট নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত গেজেটে ফরিদপুর-৪ আসনের ভাঙ্গার আলগী ও হামিরদি ইউনিয়নকে ফরিদপুর-২ আসনে সংযুক্ত করা হয়। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা আন্দোলনে নেমেছেন। গত পাঁচ দিনে তিন দফায় মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ হয়েছে। সোমবারের সহিংসতা ছিল সর্বাধিক ব্যাপক।

গতকালের সহিংস পরিস্থিতির বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. কামরুল হাসান মোল্যা বলেন, আসন পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার। আমরা ইতোমধ্যে ঘটনাটি জানিয়ে প্রতিবেদন দিচ্ছি। আশা করছি দু-একদিনের মধ্যেই সমাধান আসবে। ভাঙ্গার জনগণ প্রশাসনের ওপর আস্থা না রেখে সরাসরি সহিংসতা বেছে নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত সমাধান না হলে পুরো ফরিদপুর অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।