- সারাদেশে কার্যক্রমের অংশ হিসেবে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরাও সহজে সেবা পাচ্ছে
- কৃষকের আয় ও উৎপাদন বাড়িয়ে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখছে বিএডিসি
- বিএডিসি’র বিভিন্ন কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন, ঘরে বসেই সার-বীজের তথ্য পাচ্ছে কৃষক
- মানসম্মত বীজ, সার ও উন্নত সেচ সুবিধা সরবরাহ করে কৃষি উৎপাদন টেকসই করতে অব্যাহতভাবে কাজ করছে বিএডিসি
- সার ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারে মিলছে বরাদ্দ ও মজুতের তথ্য
বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। কৃষিই দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য, জীবিকা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভরসা। কৃষকদের সহায়তা, কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)। কৃষি উৎপাদন টেকসই করতে হলে শুধু জমি বা শ্রমই যথেষ্ট নয়, বরং মানসম্মত বীজ, উন্নত সেচ ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত সার ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। বিএডিসি মূলত এসব দিককে কেন্দ্র করে কাজ করে থাকে।
এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকারি সংস্থা, যা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন থেকে কৃষকদের জন্য নানা ধরনের কৃষি উপকরণ সরবরাহ করছে। ঢাকা শহরে প্রধান কার্যালয় হলেও বিএডিসি’র কার্যক্রম শুধু রাজধানী বা জেলা শহরে সীমাবদ্ধ নয়। এর সেবা সারা দেশে বিস্তৃত, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কৃষকদের নাগালের মধ্যে রয়েছে বিএডিসি’র অফিস। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এর মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক কৃষকদের সরাসরি সহায়তা করে থাকে। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কৃষকরা সহজে বীজ, সার এবং সেচ সুবিধা পেয়ে থাকে। এক কথায়, গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থায় বিএডিসি এক অবিচ্ছেদ্য প্রতিষ্ঠান।
চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পরিচালনাপর্ষদের মাধ্যমে পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামো পাঁচটি উইং নিয়ে গঠিত-বীজ ও উদ্যান, ক্ষুদ্রসেচ, সার ব্যবস্থাপনা, অর্থ এবং প্রশাসন। প্রতিটি উইং নির্দিষ্ট কাজের মাধ্যমে দেশের কৃষি উৎপাদন এবং উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করছে। বিএডিসির প্রধান দায়িত্ব হলো কৃষি উপকরণের টেকসই উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহণ, সংরক্ষণ এবং বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সে লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত ও অব্যাহতভাবে কৃষকদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কৃষি উপকরণ, যেমন বীজ, সার ও সেচ সরবরাহ করে যাচ্ছে। কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে ভূগর্ভস্থ এবং ভূপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করাও কর্পোরেশনের অন্যতম দায়িত্ব। ফলে কৃষকরা সারা বছর বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের সুযোগ পাচ্ছে।
১৯৯৯ সালে প্রকাশিত এক সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিএডিসিকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করা হয়। সেই সময় থেকে শুধু সেচ নয়, মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনকেও গুরুত্ব দেয়া শুরু হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে নতুন প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে বিএডিসি’র কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। ভূপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তা প্রদান, জি-টু-জি পদ্ধতিতে সার আমদানি,বীজ উৎপাদন কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ, উচ্চফলনশীল জাতের বীজ উৎপাদন ও সমপ্রসারণ এবং বিভিন্ন প্রকার প্রতিকূল সহিষ্ণু জাতের বীজ উদ্ভাবন ও সরবরাহসহ কৃষি ও কৃষকবান্ধব কাজ করে যাচ্ছে বিএডিসি। এই সব কার্যক্রম কৃষি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
বিএডিসি দেশের কৃষি খাতে মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। নানা প্রকার শস্যবীজ উৎপাদন ও বিতরণের মাধ্যমে কৃষকের আস্থা অর্জন করেছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায় খরা, লবণাক্ততা ও বন্যা সহিষ্ণু জাতের বীজ উন্নয়ন করা হচ্ছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে ফসল উৎপাদনের জন্য সেচ অপরিহার্য।
বিএডিসি ক্ষুদ্র সেচের উন্নয়নে নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। ভূগর্ভস্থ টিউবওয়েল, ডিপ টিউবওয়েল, লিফট পাম্পসহ বিভিন্ন সেচ সুবিধা কৃষকদের সরবরাহ করা হচ্ছে। ভূপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে সেচ খরচ কমানো, পানি অপচয় রোধ এবং পরিবেশবান্ধব সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে। বিএডিসি নাইট্রোজেনবিহীন সার সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জি-টু-জি ভিত্তিতে সার আমদানি করে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।
এর ফলে কৃষকরা সময়মতো প্রয়োজনীয় সার পেতে পারছে, যা কৃষি উৎপাদন বজায় রাখতে অপরিহার্য। বিএডিসি শুধু কৃষি উপকরণ সরবরাহ করছে না, বরং কৃষকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে। মানসম্মত বীজ ও সেচ সুবিধা পাওয়ায় কৃষকরা উৎপাদনে আগ্রহী হচ্ছে এবং আয়ও বাড়ছে।
বিএডিসির বিভিন্ন কার্যক্রম অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে বলে আমার সংবাদকে জানান প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এস এ এম এস এম সাঈব।
তিনি বলেন, অনলাইনে বিএডিসির নিবন্ধিত ডিলার কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে আবেদন ও নবায়ন ফি জমাদান করা হয়। যুগ্মপরিচালক (সার) কর্তৃক অনলাইন আবেদন যাচাই-বাছাইকরণ ও অনুমোদন এবং ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নকৃত লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। আগে এক্ষেত্রে ৫টি ধাপ অনুসরণ করা হত, ১০ দিন সময় লাগত ও ০৬ জনের সম্পৃক্ততা ছিল। বর্তমানে সেবাটি ২টি ধাপে, ৩ দিনে ও ২ জনের সম্পৃক্ততায় কার্য সম্পাদন করা হচ্ছে। অনলাইন প্রক্রিয়ায় সেবাটি বাস্তবায়ন করার ফলে সার ডিলারশিপ নবায়নে সময় ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে ডিলারগণ ঘরে বসেই অনলাইনে ডিলারশিপ নবায়ন করতে পারছে। এছাড়া ডিলার নিবন্ধন/নবায়ন এর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর অনলাইনে নির্ধারিত ফরমে বীজ ডিলার হতে ইচ্ছুক ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আবেদন ফি ও নিবন্ধিত ডিলার কর্তৃক নবায়ন ফি জমাদান করা হয়। উপপরিচালক (বীজ বিপণন) কর্তৃক আবেদন যাচাই-বাছাইকরণ ও অনুমোদন এবং ডিজিটাল প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাইসেন্স ইস্যু করা হয়।
অনলাইন প্রক্রিয়া সেবাটি বাস্তবায়ন করার ফলে বীজ ডিলার নিবন্ধন ও নবায় সময় ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে ঘরে বে অনলাইনে সংশ্লিষ্টরা ডিলারশিপ নিবন্ধন/নবায়ন ক পারছে। বীজ সংরক্ষণ ও বিতরণ সফটওয়ারের মাধ্যমে বিএডিসি’র সংশ্লিষ্ট বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, বীজ উৎপাদন কেন্দ্র , খামার এবং কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স জোন ইত্যাদি থেকে দৈনিক সংগৃহীত বীজের তথ্য পাওয়া যায়। বিএডিসি’র বিভিন্ন বীজ বিতরণ অঞ্চল/ট্রানজিট (বীজ বিক্রয় দপ্তর) এবং বিভিন্ন বীপ্রকে/ বীজ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত বীজের তথ্য, দৈনিক বীজ বিক্রয়ের তথ্যাদি পাওয়া যায়। চাষিসহ অন্যান্য ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান বিএডিসির চলতি বছর এবং বিগত বছরগুলোতে কী পরিমান ধান, গম ও ভুট্টা বীজ সংগ্রহ করেছে, কেজি প্রতি বীজের সংগ্রহ/বিক্রয় মূল্য এর তথ্যাদি ঙহষরহব এ দেখতে পাবেন এবং প্রয়োজনে প্রিন্ট নিতে পারবেন। অনলাইনে এ বিএডিসির বীজ সংগ্রহ কর্মসূচি দেখে কৃষক, ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান তাদের কৃষি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন। এ ছাড়া সার ব্যবস্থাপনা সফটওয়ারের মাধ্যমে সারের বরাদ্দ, মজুত, বিক্রয় ও বিতরণের সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, এ সফটওয়ারের মাধ্যমে কৃষকগণ সারের বরাদ্দ, মজুত ও বিতরণের তথ্যাদি ঘরে বসেই জানতে পারেন। কৃষকের যে সার দরকার তার মজুত আছে কিনা তা জেনে তিনি সার সংগ্রহ করতে পারেন। ফলে তার সময় ও শ্রমের অপচয় রোধ হয়। তাছাড়া বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারগণ এ সফটওয়ারের মাধ্যমে সারের বর্তমান তথ্যসহ বিগত বছরসমূহের সারের আমদানি, মজুত এবং বিতরণের তথ্য খুব সহজেই জানতে পারেন। এক সময় যেখানে কৃষকদের পর্যাপ্ত উপকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগতে হতো, আজ সেখানে বিএডিসি নির্ভরতার জায়গা তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের কৃষিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
এ পরিস্থিতিতে টেকসই কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি। বিএডিসি এ দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিকূল সহিষ্ণু বীজ, পরিবেশবান্ধব সেচ এবং সঠিক সময়ে সার সরবরাহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কৃষিকে আরও টেকসই করার পথে এগিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এর কার্যক্রমের ফলে কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তা মজবুত হচ্ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে। কৃষি উপকরণ উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণের মাধ্যমে বিএডিসি বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন দেশের কৃষিকে এগিয়ে নিতে এক অবিচ্ছেদ্য অংশীদার। উন্নত বীজ, সেচ ও সার সরবরাহের মাধ্যমে কৃষককে সহায়তা করে এই সংস্থা জাতীয় খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে কার্যকর অবদান রাখছে। বলা যায়, কৃষকের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সহজ ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে বিএডিসি হচ্ছে দেশের কৃষি উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন