ডেঙ্গুতে রেকর্ড মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫, ১২:০৪ এএম
ডেঙ্গুতে রেকর্ড মৃত্যু
  • একদিনে সর্বোচ্চ ১২ জনের মৃত্যু
  • চলতি বছর মোট প্রাণহানি ১৭৯
  • হাসপাতালে ভর্তি ৭৪০ জন, মোট আক্রান্ত ৪১,৮৩১
  • পুরুষ আক্রান্ত ৬০%, নারী ৪০%
  • বিশেষজ্ঞদের মতে অক্টোবরে ঝুঁকি বাড়তে পারে

ডেঙ্গুর পরিস্থিতি এ বছর ক্রমেই মারাত্মক আকার ধারণ করছে। গতকাল  রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এটি চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দৈনিক মৃত্যু এবং গত এক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ রেকর্ড। 

এনিয়ে ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৭৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ২০-২১ সেপ্টেম্বর সময়কালে সারাদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নতুন করে ৭৪০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর ফলে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৪১ হাজার ৮৩১ জন। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। নতুন আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে সর্বাধিক রোগী ঢাকায়। 

গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ৩৮৪ জন। এরপর বরিশালে ১৬৫ জন, চট্টগ্রামে ৭৭ জন, ময়মনসিংহে ২২ জন, খুলনায় ৫২ জন, রাজশাহীতে ২৮ জন, রংপুরে ৩ জন এবং সিলেটে ৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। 

এই তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, ঢাকার বাইরে বিশেষ করে বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের হার এখনও বেশি। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে পুরুষ ৬০ দশমিক ৩ শতাংশ এবং নারী ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ। মৃত্যুর হিসাবেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। এ বছর মৃতদের মধ্যে পুরুষ ৯২ জন এবং নারী ৮৭ জন। 

একদিনে ১২ জনের মৃত্যু বাংলাদেশের ডেঙ্গু ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর আগে ২০১৩ সালের ১৫ অক্টোবর একইদিনে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। প্রায় এক দশক পর আবারও সমান সংখ্যক মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর হলো ডেঙ্গুর মূল মৌসুম। এ সময় এডিস মশা দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। 

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছর বৃষ্টিপাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র বেড়েছে। পাশাপাশি নগর এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু নগরাঞ্চলের সমস্যা নয়। বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রামসহ গ্রামীণ এলাকাতেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। রোগী বাড়ার সঙ্গে হাসপাতালের চাপও বাড়ছে। এটি এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। 

রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ডেঙ্গু রোগীদের ভিড় দিন দিন বাড়ছে। অনেক হাসপাতালে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ডেঙ্গুতে ভর্তি রোগী সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। একইভাবে মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজেও রোগীর চাপ বেশি। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। রক্ত পরীক্ষা, স্যালাইন সরবরাহ এবং বিশেষ ইউনিট খোলা হয়েছে। তবুও জনবল সংকট ও শয্যা সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এডিস মশা নিধনে বিশেষ অভিযান চলছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় ফগার মেশিন, লার্ভিসাইড স্প্রে এবং বাসাবাড়ি পরিদর্শন করা হচ্ছে। 

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র সরকারি পদক্ষেপে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব নয়। জনসচেতনতা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলছে, আমরা বাসাবাড়িতে গিয়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছি। যেখানে পানি জমছে সেগুলো সরাসরি পরিষ্কার করার নির্দেশ দিচ্ছি। তবে নাগরিকরা যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন না করেন, তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে। 

চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঘরের ভেতর ও আশপাশে পানি জমতে না দেয়া। ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ড্রাম, এসির পানি জমা, এবং ছাদে রাখা টব- সবখানেই এডিস মশার প্রজনন হতে পারে। তাই সপ্তাহে অন্তত একদিন এসব জায়গা পরিষ্কার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। 

এছাড়া জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে বলা হচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, স্ব-চিকিৎসা এবং ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা বিপজ্জনক হতে পারে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ আগামী অক্টোবর পর্যন্ত আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হাসপাতালে শয্যা বৃদ্ধি, রক্ত সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং চিকিৎসক-নার্সদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি গুজব ঠেকাতে এবং সঠিক তথ্য প্রদানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিনের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করছে।