- ভোর থেকে অবিরাম বৃষ্টিতে অচল রাজধানী
- অফিসযাত্রী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ
- বাস সংকটে বাড়তি ভাড়া, দিনমজুরদের আয় কমেছে
- জলাবদ্ধতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক যুবকের মৃত্যু
- বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার ব্যর্থতা মূল কারণ
- আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, নতুন লঘুচাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা
রাজধানী ঢাকায় গতকাল সোমবার ভোর থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে জনজীবন একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে। কয়েক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণে হাজারীবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, মিরপুর, ধানমন্ডি, আজিমপুর ও মোহাম্মদপুরসহ অধিকাংশ এলাকায় হাঁটুপানি জমে যায়।
সড়কজুড়ে পানি জমে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়, নগরবাসীকে পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। সকালে অফিসগামীদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।
অনেক জায়গায় বাস, সিএনজি এমনকি রিকশাও চলেনি। বাধ্য হয়ে অনেকে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন।
পুরান ঢাকার সুরিটোলা থেকে গুলিস্তানগামী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সুমন হোসেন বলেন, ‘সকাল ৮টায় বের হয়েছি, ৯টা পর্যন্ত কোনো গাড়ি পাইনি। হাঁটুপানি ভেঙে জুতা হাতে নিয়ে হেঁটেই অফিসে পৌঁছাতে হয়েছে।’
ধানমন্ডি থেকে মতিঝিলগামী ব্যাংক কর্মকর্তা রাসেল আহমেদ জানান, প্রতিদিন একটি মাত্র বাসে যাতায়াত করেন। কিন্তু আজ বাস না পেয়ে সিএনজি নিতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি বলেন, “বৃষ্টিতে সবারই সমস্যা হচ্ছে, তবে একটি ভালো দিক হলো ঢাকার বায়ুমান উন্নত হয়েছে।” শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগও ছিল চোখে পড়ার মতো।
রাজধানীর বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী রাজিব আহসান বলেন, “আজকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক পরীক্ষা থাকায় বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা সত্ত্বেও যেতে হয়েছে। তবে ছাতা থাকলেও কোনো কাজ হয়নি।”
ধানমন্ডি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী তাসনিম আক্তারের মা আয়েশা আক্তার বলেন, “আমরা দুজনই ভিজে গেছি। পড়াশোনা বন্ধ থাকে না, তাই ভোগান্তি সহ্য করেই স্কুলে যেতে হয়েছে।” রাস্তায় বাস কম থাকায় বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
মোহাম্মদপুর থেকে আজিমপুরগামী যাত্রী সোহরাব হোসেন জানান, “আগে এক বাসেই যাওয়া যেত, কিন্তু আজ বাস পাইনি। সায়েন্সল্যাব পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে এরপর অন্য বাস নিয়েছি। তার ওপর চালকরা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে।”
সিটি কলেজ থেকে সচিবালয়গামী যাত্রী সুমন সিকদার বলেন, “বাসে ঠাসাঠাসি ভিড়। যারা সচ্ছল তারা বাধ্য হয়ে রিকশা বা সিএনজিতে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে গিয়েছে।” দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপরও বৃষ্টির প্রভাব পড়ে।
হাজারীবাগের সবজি বিক্রেতা শামীম মিয়া বলেন, “সাধারণত সকালেই বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু আজ পানি জমে মানুষ ঘর থেকে বের হয়নি। তাই বিক্রি কম হয়েছে, লোকসান গুনতে হলো।”
অন্য বিক্রেতা হাসিব মোল্লা বলেন, “অনেক সবজি নষ্ট হয়ে গেছে, তাই কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। এতে আজকের দিনটা ক্ষতির।”
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকায় জলাবদ্ধতা এখন মৌসুমি দুর্যোগ নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা।
স্থপতি তাহসিন রহমান বলেন, “প্রতি বছর একই দৃশ্য। ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপ্রতুল ও অপরিকল্পিত। জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি নামার ব্যবস্থা থাকে না। এখনই সমন্বিত পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনা ও জলাধার রক্ষার নীতি গ্রহণ জরুরি।”
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর অক্ষ বর্তমানে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি সক্রিয় রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় আগামী ২৪ ঘণ্টায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া ২৪ সেপ্টেম্বরের দিকে আরও একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়ে ঘণীভূত হতে পারে। ফলে আগামী কয়েকদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
রাজধানীর বংশালের নাজিরা বাজার চৌরাস্তা এলাকায় সাইকেল চালানোর সময় পানিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান দোকান কর্মচারী মো. আমিন (৩০)। সকাল পৌনে ১০টার দিকে অচেতন অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা জিসান জানান, “অল্প বৃষ্টিতেই এই এলাকায় পানি জমে। আজ সকালে আমিন সাইকেল চালাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। বাঁশ দিয়ে টেনে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে আনি।”
ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি বংশাল থানা পুলিশকে জানানো হয়েছে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন