রাজউক সেবায় স্বচ্ছতার গতি 

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫, ১১:২৯ পিএম
রাজউক সেবায় স্বচ্ছতার গতি 
  • রাজউকের অনলাইন সেবায় বেড়েছে স্বচ্ছতা ও কাজের গতি
  • নগর পরিকল্পনায় রাজউকের দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান, ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান বাস্তবায়নেও অগ্রগতি
  • অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে রাজউকের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত
  • ভবন নির্মাণে মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজউকের পরিদর্শন-অভিযান
  • পরিবেশবান্ধব নগরায়ণে জোর দিতে রাজউকের পরিকল্পনা

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থা হিসেবে ঢাকা শহরের পরিকল্পিত উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। এক সময় নানা সমালোচনার মুখে থাকা এই সংস্থাটি সামপ্রতিক সময়গুলোতে একাধিক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়ে রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনায় প্রশংসনীয় অগ্রগতি সাধন করেছে। 

নগর পরিকল্পনা, ভূমি উন্নয়ন, হোল্ডিং নাম্বার বিতরণ, অনলাইন সেবা এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের মতো কার্যক্রমে রাজউকের আধুনিক ও জনবান্ধব উদ্যোগ ঢাকাবাসীর কাছে আশার আলো জাগিয়েছে। 

রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি অংশ হলো জনসেবামূলক কাজ।

রাজধানী ঢাকাকে একটি পরিকল্পিত, আধুনিক এবং নাগরিকবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তুলতে রাজউক সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে নানামুখী সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

রাজউকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবার মধ্যে রয়েছে ভবনের নকশা অনুমোদনের কাজ। যেকোনো বহুতল ভবন নির্মাণের আগে মালিক বা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে রাজউকের কাছ থেকে অনুমোদিত নকশা গ্রহণ করতে হয়। এতে করে রাজধানীর প্রতিটি ভবন নির্ধারিত নিয়ম, নিরাপত্তা ও স্থাপত্য নীতিমালার আওতায় নির্মিত হচ্ছে, যা নগর ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এর ব্যতিক্রম হলেই নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিচ্ছে রাজউক। এতে করে অপরিকল্পিত বাণিজ্যিকায়ন, পরিবেশ দূষণ ও যানজট প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে রাজউক। 

রাজউকের অধীনে বরাদ্দকৃত প্লট বা ফ্ল্যাটের মালিকানা হস্তান্তর ও নামজারির কাজও এই সংস্থার আওতায় পড়ে। এসব কার্যক্রম অনলাইনের মাধ্যমে সহজ করার ফলে এখন নাগরিকরা কম সময়ে এবং কম জটিলতায় মালিকানা পরিবর্তনের সুযোগ পাচ্ছেন। এর ফলে আবাসন খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বেড়েছে।

নাগরিকদের অনলাইনে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও বড় অগ্রগতি দেখিয়েছে রাজউক। রাজউক বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সেবা প্রদান করছে। 

অনলাইনে বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন, হোল্ডিং নাম্বার যাচাই, সম্পত্তির তথ্য যাচাইয়ের মতো সেবা জনগণের হাতের নাগালে এসেছে। এ উদ্যোগে দুর্নীতি ও হয়রানি অনেকাংশে কমেছে বলে মত নগর পরিকল্পনাবিদ ও নাগরিক সমাজের। তবে মাঝখানে অনলাইন সেবা  বেশকিছুদিন বন্ধ ছিল। 

এখন আবারও অনলাইন সেবা ও সফটওয়্যার চালু হয়েছে বলে আমার সংবাদকে জানিয়েছেন রাজউকের পরিচালক (বোর্ড, জনসংযোগ ও প্রটোকল) শীলাব্রত কর্মকার।

আমার সংবাদকে এ কর্মকর্তা বলেন,“সম্পূর্ণভাবে সফটওয়্যার আবার চালু করা হয়েছে। প্রায় মাসখানেক হচ্ছে নাগরিকরা আগের মতোই সেবা গ্রহণ করতে পারছে।”  রাজউক বিভিন্ন সময় পূর্বাচল, উত্তরা, ঝিলমিলসহ বিভিন্ন পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প পরিচালনা করছে। এসব প্রকল্পে সাধারণ নাগরিকদের জন্য প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়া হয়। এতে করে মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ একটি নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসনের সুযোগ পাচ্ছেন । নির্মাণ শেষ হওয়ার পর, একটি ভবন বসবাস বা ব্যবহারযোগ্য কিনা তা যাচাই করে রাজউক ‘ব্যবহার অনুমোদন’ বা ‘অকুপেন্সি সার্টিফিকেট’ প্রদান করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য মানদণ্ড নিশ্চিত করছে রাজউক।

রাজউক রাজধানীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সে অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্ট্রাকচার প্ল্যান, ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান,মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নে কাজ করছে রাজউক। এসব পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নগরায়ণের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে যা সড়ক, ড্রেনেজ, জলাধার, পার্ক এবং আবাসন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিত ও গোছানো রাখতে সহায়তা করবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব পরিকল্পনা হালনাগাদ করে আধুনিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেও কাজ করছে রাজউক। 

শুধু পরিকল্পনা নয়, রাজউকের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার একটি ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান।  ২০২২ সালে অনুমোদিত এ পরিকল্পনার আওতায় রাজধানীর জমি ব্যবহার, উচ্চতা নির্ধারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, খেলার মাঠ ও খাল সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে,যা বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করছে রাজউক। ইতোমধ্যে বেশ কিছু এলাকায় অননুমোদিত ভবন নির্মাণ বন্ধ করা হয়েছে। খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে, যা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। খাল দখলমুক্ত করার কার্যক্রমও সামপ্রতিক সময়ে অভাবনীয় সফলতা অর্জন করেছে রাজউক। 

রাজধানীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হলো খাল ও প্রাকৃতিক জলাধার দখল। রাজউক এখন সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে খাল উদ্ধার ও পুনঃখননের কাজ করছে। রাজধানীর বেশকয়েকটি খাল ইতোমধ্যে দখলমুক্ত করা হয়েছে এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় ওয়াকওয়ে ও সবুজায়নের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। রাজউকের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় যেসব ভবন নির্মাণ হচ্ছে, সেগুলোর মান, নিরাপত্তা এবং অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ নিশ্চিত করতে রাজউক নিয়মিত তদারকি ও পরিদর্শন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এতে করে অবৈধ বা ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে। 

শুধু খাল নয়, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেও কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে রাজউক। রাজউকের নিয়মিত উচ্ছেদ কার্যক্রম এখন আরও গতিশীল হয়েছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও সরকারি জমি উদ্ধার করে সেখানে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থান তৈরি করছে সংস্থাটি। বিশেষ করে মহাখালী, উত্তরা ও পলাশবাড়ী এলাকায় শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অনেক ভবন মালিক অনুমোদিত নকশা না মেনে এবং নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করছেন। এতে শুধু নগরীর শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে না, একই সঙ্গে জনসাধারণের নিরাপত্তাও মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। এসব অনিয়ম ঠেকাতে ভবন মালিকদের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে রাজউক। অনুমোদন ছাড়া কোনো স্থাপনা তৈরি করলে তা নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। 

রাজউকের নতুন প্ল্যানগুলোতে সবুজায়ন, খোলা স্থান সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব নগরায়ণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নগর উন্নয়নে নাগরিকদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেও রাজউক এখন বেশি মনোযোগী। বিভিন্ন পরিকল্পনায় নাগরিকদের মতামত গ্রহণ, খোলা ফোরাম, হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। রাজউকের হটলাইন ও ফেসবুক পেজে প্রতিদিন অসংখ্য নাগরিক তাদের অভিযোগ ও পরামর্শ দিচ্ছেন, এবং কর্তৃপক্ষ তা গুরুত্বসহকারে দেখছে।

এক সময় যাকে ঘিরে দুর্নীতি, জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির অভিযোগ ছিল, সেই রাজউক এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে একটি আধুনিক, দায়িত্বশীল এবং স্বচ্ছ নগর উন্নয়ন সংস্থায়। 

নগরবাসীর প্রত্যাশা, রাজউকের এই ইতিবাচক পরিবর্তন ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে এবং একদিন ঢাকা সত্যিই একটি পরিকল্পিত, বাসযোগ্য ও সবুজ নগরীতে পরিণত হবে।