মামলার ফাঁদে রেলওয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৫, ১১:২৪ পিএম
মামলার ফাঁদে রেলওয়ে
  • রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে বিচারাধীন মামলা প্রায় ১,৪৫০টি
  • ৮০ শতাংশ মামলাই ভূমি-সংক্রান্ত
  • প্রতি মাসে দায়ের হয় ৮-১০টি, নিষ্পত্তি হয় মাত্র ১-২টি
  • স্টেশনের পার্কিং ও ট্রেনের ক্যাটারিং সার্ভিসও আটকে আছে মামলার জটের কারণে
  • জনবল সংকট, অপ্রতুল অর্থায়ন ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে আইন বিভাগ কার্যত অচল

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন খাত বাংলাদেশ রেলওয়ে বর্তমানে মামলার জটের কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখে। বিশেষ করে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল, যেখানে বিপুলসংখ্যক মামলার ধীরগতি নিষ্পত্তি কার্যক্রমকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। রেলওয়ের ভূমি, ক্যাটারিং, পার্কিং স্পেস থেকে শুরু করে নিয়োগ-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে দায়ের হওয়া মামলার দীর্ঘসূত্রতা শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমই নয়, যাত্রীসেবাও ব্যাহত করছে। 

বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে পূর্বাঞ্চলের আইন শাখা প্রায় এক হাজার ৪৫০টি মামলা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই ভূমি সংক্রান্ত। 

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রয়েছে ৬৫টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৫৪০টি, জজকোর্টে ৭৭০টি এবং প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে ৭৫টি মামলা।

প্রতিমাসে নতুন করে গড়ে ৮-১০টি মামলা দায়ের হলেও নিষ্পত্তি হয় মাত্র ১-২টি। ফলে বছরের পর বছর মামলাগুলো ঝুলে থাকছে। 

চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের সামনে ১২ হাজার বর্গফুট জায়গা যাত্রীদের গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ইজারা দেয়া হয়েছিল। ইজারার মেয়াদ শেষ হলে ২০২৩ সালের শেষ দিকে রেলওয়ে নতুন করে টেন্ডার আহ্বানের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু আগের ইজারাদার প্রতিষ্ঠান নতুন করে মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করে, যা নিয়মতান্ত্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ফলে প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করে। মামলার কারণে নতুন ইজারাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া আজও থেমে আছে। এতে যাত্রীসেবায় বিঘ্ন ঘটছে এবং রেলওয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

একইভাবে ট্রেনের ভেতর খাবার সরবরাহের সেবা ক্যাটারিং সার্ভিস নিয়েও দেখা দিয়েছে আইনি জটিলতা। ২০২৩ সালে নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নেয় রেলওয়ে। ৪৫টি প্রতিষ্ঠান আবেদন ফরম সংগ্রহ করে, যার মধ্যে ৪২টি আবেদন জমা দেয়। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান নিয়ম অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকা করে জমা দিয়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে ৩৭টি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য ঘোষণা করা হলেও বাদ পড়া পাঁচটির একটি হাইকোর্টে রিট মামলা করে। সেই মামলা এখনো চলমান থাকায় ক্যাটারিং সার্ভিসে নতুন টেন্ডার আহ্বান করা যাচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পুরানো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে রেলওয়েকে।

 রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আইন কর্মকর্তা মো. আল মাহমুদ জানিয়েছেন, মামলার ধীরগতি নিষ্পত্তির অন্যতম কারণ জনবল সংকট। বর্তমানে আইন শাখায় মাত্র দু’জন কর্মকর্তা কাজ করছেন। ৫টি কোর্ট পরিদর্শকের পদ থাকলেও একটিও পূর্ণ নেই। স্টেনো টাইপিস্ট, প্রধান সহকারী, অফিস সহকারীর পদও শূন্য। আইনজীবীর সংখ্যাও সীমিত, আর যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের প্রদত্ত পারিশ্রমিক এতটাই নগণ্য যে তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন। 

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা (বাণিজ্যিক) মো. মামুন মিয়া বলেছেন, “মামলার কারণে শুধু কার পার্কিং নয়, ক্যাটারিং সার্ভিস থেকে শুরু করে আরও অনেক কিছুতেই নতুন টেন্ডার আহ্বান করা যাচ্ছে না। রেলওয়ে এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।” 

তার মতে, প্রতি দশটি মামলা দায়ের হলে কেবল একটি নিষ্পত্তি হয়। অনেক মামলার বাস্তব ভিত্তি নেই বলেও সূত্র জানিয়েছে। বরং এগুলোকে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বছরের পর বছর মামলাগুলো ঝুলে থেকে রেলওয়ের আর্থিক ক্ষতি বাড়াচ্ছে। একইসঙ্গে যাত্রীসেবার মান কমছে। 

কার পার্কিং ইজারার মাধ্যমে যে রাজস্ব আয় হওয়ার কথা, তা থমকে আছে। ক্যাটারিং সার্ভিসে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় মানোন্নয়ন হওয়ার সুযোগও বাধাগ্রস্ত। যাত্রীদের জন্য এ সমস্যার প্রভাব সরাসরি দৃশ্যমান। পার্কিং সমস্যার কারণে ভোগান্তি বাড়ছে, ট্রেনে খাবার সরবরাহে মান বজায় রাখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে রেলওয়ের রাজস্ব কমায় নতুন অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থ সংকট দেখা দিচ্ছে।