নতুন ভাসমান টার্মিনালের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৫, ১২:০১ এএম
নতুন ভাসমান টার্মিনালের উদ্যোগ
  • কক্সবাজারের মহেশখালীতে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা
  • সক্ষমতা হবে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট; দরপত্র আহ্বান চলতি মাসেই
  • বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট
  • নতুন টার্মিনাল হলে মোট সরবরাহ বাড়বে ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট
  • দুর্যোগপ্রবণ দেশে ভাসমান টার্মিনালের ঝুঁকি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
  • ১২-১৮ মাসের মধ্যে উৎপাদনে আনতে চায় জ্বালানি বিভাগ

দেশে গ্যাস সরবরাহ সংকট দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় অর্থনীতি ও শিল্প খাতে প্রভাব ফেলছে। প্রতিদিন প্রায় চার হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে অন্তত দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতি পূরণে এবং শিল্প-বিদ্যুৎ খাতকে সচল রাখতে নতুন করে আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোবাংলা। 

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। টার্মিনালটির সক্ষমতা হবে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। 

বর্তমানে প্রাক-সমীক্ষার কাজ শেষ পর্যায়ে এবং চলতি মাসেই টার্মিনাল নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হবে।

বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান টার্মিনাল কার্যকর রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করছে সামিট গ্রুপ এবং অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি। এই দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতা দৈনিক ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। নতুন টার্মিনাল কার্যকর হলে দেশের ভাসমান এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতা দাঁড়াবে ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল টেকসই সমাধান নয়। 

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছরই বিদ্যমান টার্মিনালগুলোতে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এতে শুধু গ্যাস সরবরাহই নয়, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং লোডশেডিংয়ের মতো সমস্যা দেখা দেয়। 

তাদের মতে, ভাসমান টার্মিনাল তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও কম ব্যয়ে নির্মাণ সম্ভব হলেও ল্যান্ডবেজ বা ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ সমাধান হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাৎক্ষণিক সরবরাহ বাড়ানোই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। 

সূত্র জানায়, সৌদি আরামকো, আজারবাইজানের সকার ও চীনের সিএমসি-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই টার্মিনাল নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে। টার্মিনালটি বিল্ড-ওন-অপারেট (BOOT) ভিত্তিতে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। 

এখানে শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে, নতুন মডেলের এফএসআরইউ (Floating Storage Regasification Unit) ব্যবহার করতে হবে এবং ২০১০ সালের আগের কোনো এফএসআরইউ গ্রহণযোগ্য হবে না। বিগত সরকারের সময় মহেশখালী ও পায়রায় আরও দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। 

গত বছরের মার্চে সামিট গ্রুপের সঙ্গে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে প্রাথমিক চুক্তিও হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসায় সেই চুক্তি বাতিল হয় এবং বর্তমানে তা আদালতে বিচারাধীন। ফলে নতুন করে চতুর্থ টার্মিনালের উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। 

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রাক-সমীক্ষার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দ্রুত সময়ের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হবে। তার ভাষায়, ‘গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি। ভাসমান টার্মিনালই আপাতত কার্যকর সমাধান।’ 

এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে বড় আকারের গ্যাস ঘাটতি তৈরি হয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনে যেতে পারছে না। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে অন্তত ১৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি দ্রুত কমাতেই ভাসমান টার্মিনালের পরিকল্পনা।’ 

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির কারণে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী। এ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দরকার। ভাসমান টার্মিনালগুলো ১৮ থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে নির্মাণ সম্ভব হলেও সরকার চাইছে ১২-১৮ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করতে। ‘এখানে অর্থের চেয়ে সময়টাই গুরুত্বপূর্ণ। যত দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাবে, বিদেশি বিনিয়োগ তত দ্রুত বাড়বে।’