- ইসলামী ব্যাংকে নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযান, ২০০ কর্মী ছাঁটাই, প্রায় ৫০০০ ওএসডি
- বিশেষ দক্ষতা পরীক্ষায় অংশ না নেয়ায় শাস্তি
বিগত সময়ে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই শুধুমাত্র সিভি জমা দিয়েই বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিল— কামাল উদ্দীন জসিম, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইসলামী ব্যাংক
আদালত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা, আদালত বা আইন অবমাননার ঘটনা ঘটেনি— নজরুল ইসলাম, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইসলামী ব্যাংক
দক্ষ কর্মী রাখতে নজিরবিহীন শুদ্ধি অভিযান চলছে ইসলামী ব্যাংকে। বেসরকারি এই ব্যাংকটিতে নতুন চালু করা ‘বিশেষ দক্ষতা মূল্যায়ন’ পরীক্ষায় অংশ না নেয়ায় চাকরিবিধি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২০০ কর্মীকে চাকরিচ্যুত করেছে। পাশাপাশি প্রায় পাঁচ হাজার জনকে ওএসডি (অন সার্ভিস ডিউটি) করা হয়েছে। ওএসডি হওয়া কর্মীরা বেতন-ভাতা পেলেও বর্তমানে তারা নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১৭ সালে চট্টগ্রামের প্রভাবশালী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর বহু কর্মীকে পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি সিভির ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। এসব নিয়োগের বড় একটি অংশ চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে ছিল, যার ফলে বর্তমানে ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক কর্মী ওই এলাকার লোক।
নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে ব্যাংকটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে নতুন পর্ষদ গঠন করে। এরপর নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সিনিয়র অফিসার থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পর্যন্ত পর্যায়ের কর্মীদের জন্য বিশেষ দক্ষতা মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর আয়োজিত এ পরীক্ষায় মোট ৫,৩৮৫ জন কর্মকর্তাকে পরীক্ষায় অংশ নিতে বলা হলেও উপস্থিত হন মাত্র ৪১৪ জন। উপস্থিত হওয়া কর্মকর্তারা বর্তমানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পরীক্ষায় অংশ না নেয়ায় বাকি ৪,৯৭১ জনকে পরদিন থেকেই ওএসডি করা হয়। আর যারা পরীক্ষার আয়োজন নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন বা প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছেন, তাদের মধ্যে ২০০ জনকে সরাসরি চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্যাংকের এক লিখিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ওই সময়ে চট্টগ্রাম থেকে ৭ হাজার ২২৪ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫০০ জনের বেশি শুধু পটিয়া থেকেই নিয়োগ পান। প্রায় ২ হাজার ৫০০ কর্মী বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেট জমা দিয়েছিলেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পরে এসব সার্টিফিকেট যাচাই করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। এর বাইরেও বেশ কিছু কর্মকর্তার জাল সার্টিফিকেট পাওয়া যাওয়ায় ইতোমধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এদিকে এ ঘটনায় শুরু হয়েছে নতুন অস্থিরতা।
গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জারটেক এলাকায় ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হওয়া কর্মীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন।
বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, আদালতের রায় অমান্য করে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে তাদের।
তবে ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, আগে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের ২৯ আগস্ট নতুন দক্ষতা মূল্যায়ন পরীক্ষার ঘোষণা দিলে কিছু কর্মকর্তা ২৭ আগস্ট আদালতে গিয়ে পরীক্ষা স্থগিত ও বাতিলের আবেদন করেন। পরে আদালত বিষয়টি নিয়ে নির্দেশনা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর দায়িত্ব দেন।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক পরিষ্কার করে যে, বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা নেয়া এবং চাকরিতে কাউকে নিয়োগ বা বাদ দেয়ার ব্যাপার ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব এখতিয়ারে পড়ে। সেই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ ২৭ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করে।
এ বিষয়ে গণমাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘এটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার বিষয় নয়। তবে অতীতে কেন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়া কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল এবং এখন কেন কর্মী ছাঁটাই করার জন্য মূল্যায়ন পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে, এই প্রশ্ন আদালতে উঠতে পারে। ইসলামী ব্যাংক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তাই নিয়োগ বা কর্মী যাচাই তাদের নিজস্ব এখতিয়ার। তবে এটি অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইন ও নীতিমালার আওতায় করতে হবে।’
এ বিষয়ে আমার সংবাদকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী ব্যাংকের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, এস আলম গ্রুপের সময় অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটিকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। অযোগ্য লোক নিয়োগের কারণে ব্যাংক অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের স্বার্থে সবাইকে যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ব্যাংকের উন্নতির জন্য সবাইকে যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নিতে বলা হয়েছে।
আদালত অবমাননা করা হয়েছে কিনা জানতে আমার সংবাদ যোগাযোগ করে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সাথে। ব্যাংকটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম জানান, কয়েকজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে রিট করলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে নিষ্পত্তি করার জন্য নির্দেশনা দেয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতিক্রমেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-এর মাধ্যমে এই বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করে। এতে আদালত বা আইন অবমাননার ঘটনা ঘটেনি।
ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) কামাল উদ্দীন জসিম বলেন, বিগত সময়ে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিল। শুধুমাত্র সিভি জমা দিয়েই চাকরি পাওয়া গেছে। এ জন্য মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে অযোগ্যদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ ইসলামী ব্যাংকের অভ্যন্তরে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে, যা ব্যাংকটিকে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পথ তৈরি করতে পারে। এটি শুধু একটি সাধারণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন