শান্তিরক্ষা সংকোচন শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০২৫, ১২:০৮ এএম
শান্তিরক্ষা সংকোচন শুরু
  • জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাজেট ১৫% কমছে
  • ১,৩১৩ বাংলাদেশি সেনা ফিরবেন নয় মাসে
  • কূটনীতিকদের মতে— সম্ভাবনা আছে নতুন ভূমিকার
  • জাতিসংঘে শান্তিরক্ষায় শীর্ষে বাংলাদেশ

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়া বাংলাদেশের জন্য এবার বড় ধাক্কা। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব এবার পড়ছে জাতিসংঘের বাজেটেও। ফলে আগামী নয় মাসের মধ্যে জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশন থেকে এক হাজার ৩১৩ জন বাংলাদেশি সামরিক সদস্য প্রত্যাহার করা হবে। এ সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক চিঠি ইতোমধ্যে পাঠিয়েছে জাতিসংঘের মিলিটারি অ্যাফেয়ার্স অফিস (ওএমএ)।

 জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের নির্দেশে শান্তিরক্ষা বাজেটে ১৫ শতাংশ হ্রাস আনা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়বে সরাসরি ইউনিফর্মধারী সদস্যদের ওপর। ওএমএর পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বাজেট কমানোর কারণে সদস্যসংখ্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্রাস পাবে। 

যদিও এটি সরাসরি জনবল কমানোর নির্দেশ নয়, কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতা মাঠপর্যায়ে বড় প্রভাব ফেলবে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বর্তমানে বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা ১০টি দেশ ও অঞ্চলে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে থেকেই এই ১,৩১৩ জন সদস্যকে ধাপে ধাপে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশি সদস্যসংখ্যা সবচেয়ে বেশি কমবে দক্ষিণ সুদানের মিশনে (ইউএনমিস), যেখান থেকে ৬১৭ জন সেনা ফিরবেন। 

এর বাইরে— মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র (মিনুসকা): ৩৪১ জন, সুদানের আবেই অঞ্চল (ইউনিসফা): ২৬৮ জন, কঙ্গো (মনুসকো): ৭৯ জন, পশ্চিম সাহারা (মিনুরসো): ৮ জন। এই পাঁচ মিশনেই সদস্যসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। 

জাতিসংঘ সদর দপ্তর জানিয়েছে, এ প্রক্রিয়া বিলম্ব ছাড়াই বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশের শেষ পুলিশ কন্টিনজেন্টকে কঙ্গো থেকে প্রত্যাহার করা হয়। ওই ইউনিটের ১৮০ সদস্যের মধ্যে ছিলেন ৭০ জন নারী কর্মকর্তা। এখন সামরিক বাহিনীর বড় একটি অংশকেও ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এতে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের পরিধি কিছুটা সংকুচিত হবে বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। 

ওএমএ’র ভারপ্রাপ্ত সামরিক উপদেষ্টা শেরিল পিয়ার্সের স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, চলমান আর্থিক সংকটের কারণে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়েছে। বাজেট পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সদস্যসংখ্যা সামঞ্জস্য করা হচ্ছে।  জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনকে জানানো হয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে যদি কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হবে। 

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে নীতিগত আলোচনা চলছে।

 বিআইপিএসএস-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো শাফকাত মুনীর মনে করেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী দেশ। বাজেট হ্রাসের কারণে অংশগ্রহণ কমতে পারে, তবে এটি আমাদের অবস্থান দুর্বল করবে না্তবরং এখন সময় এসেছে কৌশলগতভাবে নতুন ভূমিকা খোঁজার।

তিনি আরও বলেন, সিনিয়র পদে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ নেতৃত্ব এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার জায়গায় বাংলাদেশ আরও সক্রিয় হতে পারে। এটি শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের মর্যাদা ধরে রাখতে সাহায্য করবে। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধ-পরবর্তী মিশনে প্রথমবার অংশ নেয় বাংলাদেশ। তারপর থেকে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জাতিসংঘের পতাকাতলে কাজ করেছেন। 

বর্তমানে ৫,৬০০ জনের বেশি সদস্য বিভিন্ন মিশনে নিয়োজিত আছেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের এ অবদান শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিক ও মানবিক ক্ষেত্রেও দেশের সুনাম বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাময়িক হ্রাস দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অবস্থানকে প্রভাবিত করবে না, বরং এটি হবে নতুন ভারসাম্যের সূচনা।