- ১৩টি ইস্যুতে বৈঠকে আলোচনা
- সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী থাকবে সহায়ক ভূমিকায়
- নিরাপত্তায় থাকবে দেড় লাখ পুলিশ, ৬ লাখ আনসার
- সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা মহলে সংশয় থাকলেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে কোনো সংশয় নেই।
ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, “অবশ্যই নির্বাচন করার মতো পরিবেশ আছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত, আমরাও প্রস্তুত।”
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত হয় আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত প্রাক প্রস্তুতিমূলক বৈঠক। এতে অংশ নেন সেনাবাহিনী, নৌ ও বিমান বাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, এনএসআই, ডিজিএফআই, কোস্টগার্ড, এনটিএমসি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ।
বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কারও মধ্যেই কোনো উদ্বেগ দেখা যায়নি। বরং তারা সবাই অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
বৈঠকে ১৩টি মূল ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছিল, ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচনী এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার কৌশল, বিভিন্ন বাহিনীর কার্যক্রমে সমন্বয় আনা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার অভিযান জোরদার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য প্রতিরোধ, ডাকযোগে ভোট (পোস্টাল ভোট) ব্যবস্থাপনা, বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পার্বত্য এলাকায় হেলিকপ্টার সহায়তায় নির্বাচনী সামগ্রী পরিবহন, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সমন্বিত সহায়তা, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো ইত্যাদি।
ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব বলেন, “দুর্গাপূজার সময় এনটিএমসি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সারা দেশে ৩৫ হাজারের বেশি মণ্ডপ সফলভাবে মনিটর করা হয়েছে। একই প্রযুক্তি নির্বাচনের সময়ও ব্যবহার করা যেতে পারে “
আগে নির্বাচনের আগে-পরে ৫ দিনের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হলেও এবার প্রস্তাব এসেছে ৮ দিনের জন্য। অর্থাৎ নির্বাচনের আগে ৩ দিন, নির্বাচনের দিন, নির্বাচনের পরের ৪ দিন মাঠে থাকবে বাহিনী।
ইসি সচিব জানান, ‘বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘সব বাহিনীই তাদের নিজস্ব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে। এতে মাঠপর্যায়ের দক্ষতা ও সমন্বয় বাড়বে।’
বৈঠকে জানানো হয়, সেনাবাহিনী, নৌ ও বিমান বাহিনী নির্বাচনী সামগ্রী পরিবহন, দুর্গম অঞ্চলে সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া, পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তা প্রদানসহ সহায়ক দায়িত্ব পালন করবে।
তবে, সেনাবাহিনীকে ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার হিসেবে মোতায়েন করা হবে কী না তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
সেনাবাহিনী প্রধানের প্রতিনিধি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম, নৌবাহিনী প্রধানের প্রতিনিধি রিয়ার অ্যাডমিরাল মীর এরশাদ আলী ও বিমান বাহিনীর প্রতিনিধি এয়ার ভাইস মার্শাল রুশাদ দিন আসাদ বৈঠকে অংশ নিয়ে নিজ নিজ বাহিনীর প্রস্তুতি তুলে ধরেন।
নির্বাচনী নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভোটের দিন দেড় লাখ পুলিশ সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম।
সবচেয়ে বড় বাহিনী হিসেবে থাকবে আনসার ও ভিডিপির সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ সদস্য, যারা প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেবেন।
এছাড়া সেনাবাহিনী থেকে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ সদস্য থাকবেন বলে জানানো হয়।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, র্যাব প্রধান এ কে এম শহিদুর রহমান, এনএসআই মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সরওয়ার ফরিদ, ডিজিএফআই মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম, কোস্টগার্ড প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল জিয়াউল হক এবং এনটিএমসি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল কাইয়ুম মোল্লাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচনী তদারকি বাড়াতে বডি-ওর্ন ক্যামেরা, ড্রোন ও আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব এসেছে।
এ বিষয়ে ইসি সচিব বলেন, ‘ড্রোন ব্যবহারের অনুমতি থাকবে কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য। রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী কেউই নির্বাচনী প্রচারণায় ড্রোন ব্যবহার করতে পারবেন না।’
ভোটকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে রিয়েল টাইম ভিডিও ফিড চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এতে ঢাকায় বসে কেন্দ্র পর্যায়ের পরিস্থিতি মনিটর করা যাবে বলে জানান তিনি।
বৈঠকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সহিংসতায় লুট হওয়া অস্ত্রের ৮৫ শতাংশ উদ্ধার করা হয়েছে, বাকি অংশের অনুসন্ধান চলছে।
ইসি সচিব বলেন, “নির্বাচনের আগে দেশের কোনো জায়গায় যাতে অস্ত্র বা সহিংসতার ঝুঁকি না থাকে, সে বিষয়ে বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।”
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বরাদ্দ বাজেট এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে প্রশিক্ষণ, পরিবহন, লজিস্টিকসহ সব সংস্থা নিজ নিজ প্রস্তাব দেবে বলে জানিয়েছেন সচিব।
তিনি বলেন, ‘ধাপে ধাপে আলোচনার মাধ্যমে বাজেট চূড়ান্ত করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও নির্বাচনকালীন ব্যয়ের বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।’
বৈঠকে অংশ নেওয়া সবাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেন।
ইসি সচিব জানান, ‘প্রতিটি জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা মনিটরিং সেল থাকবে। কোনো গুজব বা সহিংসতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ইসি সচিব বলেন, ‘আজকের বৈঠকটি ছিল প্রস্তুতিমূলক। এটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। আমরা ধারাবাহিকভাবে এই আলোচনা চালিয়ে যাব। লক্ষ্য একটাই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা।’
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে। আমরা চাই ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে হাসি ফুটুক, আতঙ্ক নয়।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন সব প্রস্তুতি শুরু করেছে। তবে কিছু রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন পুলিশের নিরপেক্ষতা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটেই আজকের বৈঠকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা আশ্বস্ত করেছেন নির্বাচনকালীন কোনো অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।
ইসি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এই যৌথ বৈঠক মূলত এক আত্মবিশ্বাসের বার্তা দিয়েছে। নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, প্রস্তুতি এগোচ্ছে, বাহিনীসমূহ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
যদিও মাঠের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখনো কিছুটা অনিশ্চিত, তবু প্রশাসনিক দিক থেকে নির্বাচনের রূপরেখা এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে।
বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট এখনো এক চ্যালেঞ্জ। তবে আজকের বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রায় সব বাহিনীর প্রতিশ্রুতি ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা পরিকল্পনা হয়তো নতুন আশার সঞ্চার করেছে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল এবং জনগণের ভোটের প্রতিফলন ঘটানো এক উৎসব।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন