সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ে অগ্রদূত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি

তানজিদ সরওয়ার প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২১, ২০২৫, ০৫:২৪ পিএম
সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ে অগ্রদূত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী আদর্শ ও শরিয়াহভিত্তিক অর্থনীতির পথিকৃৎ হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে সুদমুক্ত ও নৈতিক ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং একটি মানবিক, কল্যাণমুখী ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি মূলত সুদমুক্ত ও শরিয়াহ মোতাবেক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। ইসলামী শরিয়াহর মৌলিক নীতি অনুযায়ী সুদ (রিবা) পরিহার করে ন্যায়সংগত লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যাংকটি আমানত গ্রহণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ ক্ষেত্রে মুদারাবা, মুশারাকা, মুরাবাহা, ইজারা ও বাই-সালামসহ বিভিন্ন শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

ব্যাংকটির প্রধান লক্ষ্য হলো সুদবিহীন লেনদেন নিশ্চিত করে একটি নৈতিক ও ইনসাফভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে গ্রাহক ও ব্যাংক উভয়েই লাভ ও ঝুঁকির অংশীদার হয়। এই দর্শনই ইসলামী ব্যাংককে দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে গেছে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি বিভিন্ন ধরনের শরিয়াহভিত্তিক আমানত স্কিমের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। মুদারাবা সেভিংস ডিপোজিট, মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট, হজ্জ ডিপোজিট স্কিম, মাসিক মুনাফাভিত্তিক আমানত প্রকল্পসহ নানাবিধ স্কিমের মাধ্যমে ব্যাংকটি বিপুল পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এসব আমানত কেবল ব্যাংকের মূলধন শক্তিশালী করছে না, বরং দেশের উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগের পথও সুগম করছে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, এসএমই ও মাইক্রোফিনান্স খাতে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য সহজ ও ন্যায্য বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

কৃষিখাতে বাই-সালাম ও ইজারা ভিত্তিক বিনিয়োগ কৃষকদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ফলে ইসলামী ব্যাংক একটি উৎপাদনমুখী অর্থনীতির অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় বা রেমিটেন্স। এ খাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষস্থানীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত এক্সচেঞ্জ হাউস ও ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দ্রুত, নিরাপদ ও সহজ রেমিটেন্স সেবা প্রদান করছে।

একই সঙ্গে আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে এলসি (L/C) খোলা, বিল কালেকশন ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে ব্যাংকটি দক্ষতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। এর ফলে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ইসলামী ব্যাংকও পিছিয়ে নেই। এটিএম, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস ‘সেলফিন’ এর মাধ্যমে গ্রাহকদের আধুনিক ও নিরাপদ ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। গ্রাহকরা এখন ঘরে বসেই হিসাব দেখা, টাকা স্থানান্তর, বিল পরিশোধসহ নানা সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।

ডিজিটাল সেবার এই সম্প্রসারণ ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও গ্রাহকবান্ধব করেছে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি। ব্যাংকটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মাইক্রোক্রেডিট কর্মসূচি, শিক্ষা বৃত্তি ও স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আইবিবিএলের এই মানবিক উদ্যোগ দেশের সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম ইসলামী ব্যাংক। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এটি ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি মডেল হিসেবে দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি পেয়েছে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অন্যতম।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খান ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি একই ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি ও অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৮৬ সালে ইসলামী ব্যাংকে যোগদান করা মো. ওমর ফারুক খান দীর্ঘ প্রায় চার দশকের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। ডিএমডি, মহাব্যবস্থাপক ও ব্যবস্থাপক পর্যায়ের দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তার নেতৃত্বে একটি সুশৃঙ্খল ও গতিশীল ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে উঠেছে।

তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, নৈতিক দৃঢ়তা ও কৌশলগত দিকনির্দেশনায় ব্যাংকটি অপব্যবস্থাপনা রোধ, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং গ্রাহক আস্থা পুনর্গঠনে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি শুধু একটি ব্যাংক নয় এটি একটি আদর্শভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যা সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিল্প, বাণিজ্য, রপ্তানি, রেমিটেন্স ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে।

শরিয়াহনীতি অনুসরণ করে নৈতিক ও টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইসলামী ব্যাংকের অবদান ভবিষ্যতেও আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী হবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।

জেএইচআর