ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬

জামায়াত-এনসিপি জোটে নতুন চ্যালেঞ্জ

তানজিদ সরওয়ার প্রকাশিত: জানুয়ারি ৬, ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
জামায়াত-এনসিপি জোটে নতুন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশি রাজনীতির চিরচেনা সমীকরণগুলোতে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক অভাবনীয় ও নজিরবিহীন মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণত উপ-মহাদেশীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে জোট-মহাজোটের সংস্কৃতি অত্যন্ত পুরনো। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

একদিকে রাজপথের দীর্ঘদিনের শক্তি জামায়াতে ইসলামী, অন্যদিকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক শক্তি ‘এনসিপি’। এই দুই বিপরীতধর্মী স্রোতের মিলন কেবল একটি নির্বাচনি সমঝোতা নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যাকরণ পরিবর্তনের এক মহড়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

জোটের জন্মকথা : বাধ্যবাধকতা নাকি কৌশল

এনসিপি বা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি যখন আত্মপ্রকাশ করেছিল, তখন তাদের প্রধান স্লোগান ছিল ‘তৃতীয় শক্তি’ এবং ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’। দেশের প্রচলিত বড় দুই বলয়ের বাইরে গিয়ে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এক হাজার ৪৮৪টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে তারা একক শক্তিতে ৩০০ আসনে লড়াইয়ের বার্তাও দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনি ট্রেনের বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে তাদের এই অবস্থান থেকে সরে আসতে দেখা যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে দুটি মূল অনুঘটক কাজ করেছে। প্রথমত, মাঠপর্যায়ে পেশিশক্তি এবং নির্বাচনি সহিংসতার বাস্তবতাকে মোকাবিলা করার মতো ক্যাডারভিত্তিক সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী এনসিপির এখনো গড়ে ওঠেনি। নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে উঠে আসা ‘শহীদ শরিফ ওসমান হাদি’র ঘটনার রেশ ধরে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি জোট গঠনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

দ্বিতীয়ত, ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে এককভাবে লড়াই করে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া এনসিপিকে বাস্তববাদী হতে শিখিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে, জনসমর্থন থাকলেও তা সংসদীয় আসনে জয়ের জন্য যে পরিমাণ সংহত হওয়া প্রয়োজন, তাতে এখনো ঘাটতি রয়েছে

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর জন্য এই জোট ছিল একটি কৌশলগত ‘ইমেজ মেকওভার’। ৫ আগস্ট পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জামায়াত যখন নিজেদের নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে, তখন তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি এনসিপিকে সাথে পাওয়া তাদের জন্য একটি বড় নৈতিক জয়। এছাড়াও এলডিপি এবং অন্যান্য ছোট দলগুলোকে নিয়ে একটি ‘বহুমাত্রিক’ জোট গঠনের মাধ্যমে জামায়াত মূলত বিএনপির একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার ছক কষেছে।

অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও ত্রিমুখী প্রতিক্রিয়ার ঢেউ

এই জোট গঠিত হওয়ার সাথে সাথেই রাজনৈতিক অঙ্গনে কম্পন অনুভূত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কম্পনটি এসেছে দলগুলোর অভ্যন্তর থেকে।

এনসিপির ঘরে বিদ্রোহ : জোট গঠনের ঘোষণায় এনসিপির প্রায় ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা প্রকাশ্যে বিরোধিতা শুরু করেন। তাদের যুক্তি হলো, যে জামায়াত বা আদর্শের বিরোধিতা করে তারা নতুন রাজনীতির স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তাদের সাথেই গাঁটছড়া বাঁধা দলটির আদর্শিক পরাজয়। এই বিরোধের জেরে বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ইতোমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন, যা দলটিকে একটি বড় সাংগঠনিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের অনমনীয় মনোভাব : জোটের অন্যতম শরিক ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শুরু থেকেই আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তুষ্ট। গুঞ্জন উঠেছে তারা জোট ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারে। এরই মধ্যে ২৭২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে তারা জোটের ভেতরে নিজেদের পাল্লা ভারী করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জামায়াতের তৃণমূলের ক্ষোভ : জামায়াত তাদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আসন এনসিপি এবং শরিকদের ছেড়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত কর্মীদের বড় একটি অংশ এই ত্যাগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, এনসিপিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া দলের নিজস্ব শক্তিবৃদ্ধির পথে বাধা হতে পারে।

কেন বিএনপির বদলে জামায়াত

এনসিপির রাজনৈতিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা প্রথমে বিএনপির সাথে জোট করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা না হওয়া এবং বিএনপি এককভাবে এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর এনসিপির সামনে পথ ছিল দুটি- হয় একলা চলা, না হয় জামায়াতের দিকে ঝোঁকা। শেষ পর্যন্ত তারা দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেয়। যদিও তারা দাবি করছে সংস্কার প্রশ্নে জামায়াত তাদের কাছাকাছি, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন এটি মূলত একটি ‘সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি’ বা টিকে থাকার কৌশল।

জোটের লাভ-ক্ষতির খতিয়ান : কার পাল্লা ভারী

এই জোট থেকে জামায়াত যে সুবিধাগুলো পাচ্ছে তা মূলত প্রচারণামূলক। তারা প্রমাণ করতে পারছে যে তারা এখন অচ্ছুত নয়, বরং তরুণদের সাথে নিয়ে চলতে সক্ষম। কর্নেল অলির এলডিপিকে সাথে নিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের ইস্যুতে নিজেদের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে, এনসিপির জন্য ঝুঁকিটা পাহাড়প্রমাণ।

আদর্শিক আবেদন হ্রাস : এনসিপি যে সেকুলার বা মধ্যপন্থি প্রজন্মের ভোটারদের টার্গেট করেছিল, জামায়াতের সাথে জোটের ফলে সেই ভোটারদের একটি বড় অংশ মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

সাংগঠনিক বিস্তারে বাধা : ৩০০ আসনে প্রার্থী না দেয়ার ফলে সারা দেশে দলটির যে সাংগঠনিক জাল বিস্তার করার সুযোগ ছিল, তা এখন সীমিত হয়ে পড়েছে। নির্দিষ্ট কিছু পকেটে শক্তিশালী হলেও দেশব্যাপী বিকল্প শক্তি হওয়ার স্বপ্ন আপাতত থমকে গেছে।

রাজনৈতিক সমীকরণ ও আগামীর বাংলাদেশ

আওয়ামী লীগ বিহীন এই নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি বনাম জামায়াত-এনসিপি জোটের। বিএনপির বিশাল ভোটব্যাংকের বিপরীতে জামায়াতের সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী এবং এনসিপির তরুণ আবেদন এক হয়ে কতটা ফাটল ধরাতে পারে, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

এই জোটে জামায়াতের চাওয়া হলো একটি সম্মিলিত ‘ইসলামী ও বিপ্লবী ভোটব্যাংক’ গড়ে তোলা। অন্যদিকে এনসিপির লক্ষ্য হলো সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেদের পা রাখার জায়গা করে নেয়া। তবে এই অসম জোট যদি ভোটে ব্যর্থ হয়, তবে এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পড়তে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল ভোট নয়, বরং এটি একটি বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষা যেমন নেতৃত্বের, তেমনি রাজনৈতিক আদর্শের। এনসিপি-জামায়াত জোট বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করেছে, যা একদলীয় বা দ্বিদলীয় আধিপত্যের বদলে বহুমাত্রিক গণতন্ত্রের বার্তা দিচ্ছে। তবে এই জোট কতদিন টিকে থাকবে এবং ভোটের বাক্সে এর কতটুকু প্রতিফলন ঘটবে, তা জানতে আমাদের নির্বাচনি ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।