বিচার ব্যবস্থার প্রাণ হলো সাক্ষ্য-প্রমাণ। ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন এবং ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, আদালত যখন কোনো ব্যক্তিকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করেন, তখন তিনি তা মানতে আইনত বাধ্য। এই আইনি আদেশ অমান্য করলে দণ্ডবিধি (Penal Code) এবং ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) বিভিন্ন ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে।
আদালত যদি কাউকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য 'সমন' (Summons) জারি করেন এবং সেই ব্যক্তি যদি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই অনুপস্থিত থাকেন, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
দণ্ডবিধির ১৭৪ ধারা: এই ধারা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারীর (বিচারক) আইনসম্মত আদেশ সত্ত্বেও নির্দিষ্ট স্থানে ও সময়ে উপস্থিত না হলে তাকে ১ মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে। যদি এই সমনটি কোনো আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য হয়ে থাকে, তবে সাজা বেড়ে ৬ মাস কারাদণ্ড এবং ১০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮৫এ ধারা: এই ধারার অধীনে আদালত সংক্ষেপে (Summary trial) বিচার করে সাক্ষী অনুপস্থিত থাকার জন্য জরিমানা করতে পারেন।
সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হলেন কিন্তু বিচারকের প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকার করলেন—এমন পরিস্থিতিতেও শাস্তির বিধান আছে। দণ্ডবিধির ১৭৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি আইনত সত্য বলতে বাধ্য থাকেন এবং সরকারি কর্মচারীর (বিচারক) প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকার করেন, তবে তাকে ৬ মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ১০০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার আগে সাক্ষীকে শপথ নিতে হয়। কেউ যদি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া শপথ বা প্রতিজ্ঞা (Affirmation) নিতে অস্বীকার করেন, তবে দণ্ডবিধির ১৭৮ ধারা মোতাবেক তার ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।
অনেক সময় আদালত কোনো নির্দিষ্ট দলিল বা ডকুমেন্ট আদালতে পেশ করার জন্য সমন দেন। যদি কেউ আইনত বাধ্য হওয়া সত্ত্বেও সেই দলিল জমা না দেন, তবে দণ্ডবিধির ১৭৫ ধারা অনুযায়ী তাকে ১ মাস কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা করা হতে পারে। আদালতের ক্ষেত্রে এই সাজা ৬ মাস কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
সাক্ষীরা অনেক সময় আসামিপক্ষের ভয়ে সাক্ষ্য দিতে চান না। বাংলাদেশের আইনে সরাসরি 'সাক্ষী সুরক্ষা আইন' (Witness Protection Act) ব্যাপকভাবে কার্যকর না থাকলেও বিশেষ কিছু আইনে সাক্ষীর সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে:
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন: এই আইনের অধীনে বিচার চলাকালীন সাক্ষীর পরিচয় গোপন রাখা বা রুদ্ধদ্বার কক্ষে (In-camera trial) সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যবস্থা করা যায়।
মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন: এখানেও ভিকটিম ও সাক্ষীর সুরক্ষার বিশেষ বিধান রয়েছে।
আইনে কিছু ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে একজন ব্যক্তি সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করলেও তাকে সাজা দেওয়া যায় না। এগুলোকে বলা হয় 'Privileged Communications':
দম্পতিদের গোপনীয়তা (ধারা ১২২): স্বামী বা স্ত্রী বৈবাহিক সম্পর্ক থাকাকালীন একে অপরের কাছে বলা কোনো গোপন কথা আদালতে প্রকাশ করতে বাধ্য নন।
পেশাগত গোপনীয়তা (ধারা ১২৬): একজন আইনজীবী তার মক্কেলের দেওয়া গোপন তথ্য আদালতে প্রকাশ করতে বাধ্য নন, যদি না সেটি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা হয়।
রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা (ধারা ১২৩): রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নির্দিষ্ট কিছু গোপন তথ্য প্রকাশ করতে অস্বীকার করতে পারেন।
সাক্ষ্য আইনের ১৬৫ ধারা অনুযায়ী, বিচারক সত্য উদঘাটনের জন্য যেকোনো সাক্ষীকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন এবং যেকোনো দলিল পেশ করার নির্দেশ দিতে পারেন। এই ক্ষমতার অধীনে বিচারক প্রসিডিউরাল জটিলতা এড়িয়ে সরাসরি সাক্ষীকে প্রশ্ন করতে পারেন এবং সাক্ষী উত্তর দিতে বাধ্য।
সাক্ষ্য দেওয়া কেবল নাগরিক দায়িত্ব নয়, এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠি। যদি সাধারণ মানুষ সাক্ষ্য দিতে ভয় পায় বা অনীহা প্রকাশ করে, তবে সমাজে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। তাই আইন একদিকে যেমন সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য কঠোর সাজার ব্যবস্থা রেখেছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রকেও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আরও সজাগ হতে হবে। আপনি যদি কোনো ঘটনার সাক্ষী হন, তবে আইন মেনে আদালতে উপস্থিত হওয়া আপনার আইনি কর্তব্য।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন