তফসিল ঘোষণার পরই ইসিতে উত্তাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম
তফসিল ঘোষণার পরই ইসিতে উত্তাপ
  • দাবি ও পাল্টা দাবিতে সরব রাজনৈতিক দলগুলো

ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই নির্বাচন কমিশন (ইসি), প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের জোটসঙ্গী কয়েকটি দল একের পর এক অভিযোগ তুলে বলছে, নির্বাচনী ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। পাল্টা অভিযোগ ও সন্দেহের আবহে নির্বাচন নিয়ে জনমনে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপি ও জামায়াত একাধিক নির্বাচনে জোটবদ্ধ থাকলেও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। এই পরিস্থিতিতে একে অপরের বিরুদ্ধে অবৈধ প্রভাব বিস্তার, প্রশাসন ব্যবহার এবং নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করার অভিযোগ তুলছে দলগুলো। 

গত রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, ইসির কিছু কর্মকর্তা একটি দলের হয়ে কাজ করছেন। তার ভাষায়, রিটার্নিং কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রশাসন ও পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা প্রকাশ্যেই পক্ষপাতমূলক ভূমিকা রাখছেন, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য মারাত্মক হুমকি।

একইদিন সন্ধ্যায় যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতে জামায়াতে ইসলামীও একই ধরনের অভিযোগ তোলে। দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সমান আচরণ করছে না। তার অভিযোগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধীরে ধীরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে এর আগের দিন শনিবারও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সামপ্রতিক সময়ে নির্বাচন কমিশনের কিছু ভূমিকা ও অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যদিও এসব সত্ত্বেও বিএনপি একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। 

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জামায়াত আরও অভিযোগ করে, তারেক রহমানের নিরাপত্তার নামে সরকার অতি উৎসাহী আচরণ করছে। দলটির দাবি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হলে জামায়াত আমিরকেও একই মাত্রার নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা দিতে হবে। অন্যথায় নির্বাচনী সমতার নীতি ক্ষুণ্ন হবে।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের শরিক এনসিপিও নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, একটি দলের মহাসচিবের সঙ্গে ইসির বৈঠকের পরই ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বসংক্রান্ত বিষয়ে কিছু প্রার্থীর বৈধতা দেয়া হয়েছে। 

তার মতে, নির্বাচন কমিশন এভাবে পক্ষপাতমূলক আচরণ করলে এনসিপির নির্বাচনে থাকা-না থাকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। এনসিপির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, ঢাকা-১১ আসনে তাদের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বিপক্ষে দাঁড়ানো বিএনপির প্রার্থী এম এ কাইয়ুম বিদেশি নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশন তার প্রার্থিতা বহাল রেখেছে।

বিএনপি অভিযোগ করেছে, নির্বাচন কমিশনের কিছু সিনিয়র কর্মকর্তা একটি দলের পক্ষে কাজ করছেন। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সিইসির কাছে লিখিত ও মৌখিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানান মির্জা ফখরুল। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার আচরণ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

মাঠপর্যায়ের প্রশাসন নিয়েও অভিযোগ তোলে বিএনপি। মির্জা ফখরুল বলেন, বিভিন্ন এলাকায় রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে তদন্ত সাপেক্ষে এসব কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। তবে কোন কর্মকর্তারা কোন দলের পক্ষে কাজ করছেন, সে বিষয়ে বিএনপি বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

গত রোববার সন্ধ্যায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও সরকারের কিছু উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয় বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

ডা. আবদুল্লাহ তাহের বলেন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ ধীরে ধীরে বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে জনগণের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আস্থা নষ্ট হবে বলে তিনি সতর্ক করেন। তাঁর দাবি, মাঠপর্যায়ে এসপি ও ডিসিদের আচরণে নিরপেক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট।

জামায়াতের নায়েবে আমির আরও বলেন, দলটি বিশ্বাস করে প্রধান উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চান। তবে তাঁর আশপাশের কিছু উপদেষ্টা ভুল তথ্য দিয়ে তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। সিইসির সঙ্গে বৈঠকে বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে ভোটার জালিয়াতির অভিযোগ তোলে। মির্জা ফখরুল বলেন, জামায়াতের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের এনআইডি কপি, মোবাইল নম্বর ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ করছে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঢাকার কয়েকটি আসনে একটি দল দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভোটার স্থানান্তর করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। কতজন ভোটার, কোথা থেকে এবং কোন কারণে স্থানান্তর হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জরুরি ভিত্তিতে দিতে ইসিকে অনুরোধ করা হয়েছে। পোস্টাল ব্যালট নিয়েও বিএনপি আপত্তি জানিয়েছে। দলটির দাবি, বর্তমান ব্যালট পেপারে পক্ষপাতিত্ব রয়েছে এবং একটি দলকে সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের পর নতুন করে ব্যালট ছাপানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

বিএনপি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে বিশ্বাসী উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, আচরণবিধি মানতে দলের চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত সফর পর্যন্ত বাতিল করেছেন। অথচ অন্য দলের শীর্ষ নেতারা নিয়ম ভেঙে প্রচার চালালেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
জামায়াত প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাবি জানিয়েছে, তারেক রহমানের মতো তাদের আমিরকেও সমান নিরাপত্তা ও প্রটোকল দিতে হবে। 

ডা. তাহের বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে কারও আপত্তি নেই, কিন্তু বৈষম্য হলে সেটি স্পষ্ট পক্ষপাত হিসেবে বিবেচিত হবে।

তিনি জানান, ভোটকক্ষে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব বা আনসার কাউকেই প্রবেশ করতে না দেয়ার প্রস্তাবে প্রধান উপদেষ্টা সম্মতি দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং এর জন্য অর্থ বরাদ্দও দেয়া হয়েছে।

পোস্টাল ব্যালট পরিবর্তন ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার দাবিতে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করে ছাত্রদল। সংগঠনটির অভিযোগ, একটি বিশেষ দলের প্রভাবে ব্যালটে ধানের শীষ প্রতীক নিচে রাখা হয়েছে।

এদিকে জামায়াতের নায়েবে আমির এই ঘেরাও কর্মসূচিকে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে আখ্যা দেন। তার দাবি, আপিল শুনানির সময় ইসিকে প্রভাবিত করতেই এসব কর্মসূচি দেয়া হয়েছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার দাবিরও বিরোধিতা করে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।

সব মিলিয়ে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ আর সন্দেহের আবর্তে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ভূমিকা এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। এসব অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি না হলে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।