অকুতোভয় পরিবর্তনের অগ্রদূত সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম
অকুতোভয় পরিবর্তনের অগ্রদূত সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ এক নির্ভীক জননীর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে দেশের নীতি-নির্ধারণী মহলে। তিনি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। যিনি কেবল একজন আইনজীবী নন, বরং এ দেশের মাটি, পানি আর মানুষের অধিকার আদায়ের এক অদম্য কণ্ঠস্বর। 

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তাঁর অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি নিয়োগ নয়, বরং এটি রাজপথের লড়াইকে রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রে আসীন করার এক অনন্য স্বীকৃতি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারে তিনি বর্তমানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, তথ্য ও সম্প্রচার এবং পানিসম্পদ—এই তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে চিনতে হলে আমাদের তাকাতে হবে বিগত দুই দশকের পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে। 'বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি' বা বেলা (BELA)-র প্রধান নির্বাহী হিসেবে তিনি কর্পোরেট শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, ভূমিদস্যুদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন।

যে সময়ে নদী দখল আর বনভূমি উজাড় ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, তখন তিনি আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হন।

তাঁর সততা কেবল কাগুজে নয়, বরং তাঁর কর্মক্ষেত্রে প্রতিফলিত। এই বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণেই আজ তাঁকে তিনটি ভিন্ন ধর্মী ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ভার দেওয়া হয়েছে।

সাধারণত একজন উপদেষ্টার পক্ষে একটি মন্ত্রণালয় সামলানোই কঠিন হয়ে পড়ে, সেখানে রিজওয়ানা হাসান তিনটি ভিন্ন মেরুর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তাঁর কাজের ধরন বলে দেয়, তিনি কেবল চেয়ার দখল করতে আসেননি, এসেছেন জঞ্জাল পরিষ্কার করতে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে থাকা বাংলাদেশের জন্য এই মন্ত্রণালয়টি সবচেয়ে সংবেদনশীল। রিজওয়ানা হাসান দায়িত্ব নিয়েই পরিবেশ সংরক্ষণে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। বিশেষ করে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা এবং বনভূমি রক্ষায় তাঁর কঠোর অবস্থান জনমনে নতুন আশা জাগিয়েছে।

তথ্য মন্ত্রণালয় মানেই দীর্ঘকাল ধরে ছিল সরকারের প্রচারযন্ত্র। কিন্তু রিজওয়ানা হাসানের হাত ধরে এখানে লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। তিনি গণমাধ্যমের সংস্কার এবং মুক্ত সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো তথ্য প্রবাহে স্বচ্ছতা আনা এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোকে জনগণের সম্পদে পরিণত করা।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা একটি রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু। অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ নদী শাসন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সততা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটাচ্ছেন। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কোনো প্রকার দুর্নীতি সহ্য করা হবে না বলে তিনি ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের কাজের মূল ভিত্তি হলো সততা, স্বচ্ছতা এবং গঠনমূলক সংস্কার। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি তাঁর কর্মপরিকল্পনায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। 

তিনি বলেন, আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে প্রতিটি নাগরিকের তথ্যের অধিকার থাকবে এবং প্রতিটি নদী তার হারানো যৌবন ফিরে পাবে।

সুপ্রিম কোর্টের একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে তিনি আইনের প্রতিটি মারপ্যাঁচ বোঝেন। এটি তাঁর প্রশাসনিক কাজে বিশাল বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তিনি জানেন কীভাবে আইনকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হয়। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে অত্যন্ত কঠিন এবং ব্যস্ত সময়ের মধ্য দিয়ে গেলেও তিনি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তিনটি মন্ত্রণালয়ের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর ফাইল ডেস্কে কোনো কাজ আটকে থাকে না, বরং প্রতিটি সিদ্ধান্ত হয় তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।

দেশের মানুষ আজ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের দিকে তাকিয়ে আছে এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে। কারণ তিনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন যখন রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি তুঙ্গে।

তিনি তোষামোদি অপছন্দ করেন। তাঁর ভাষা গঠনমূলক কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট। সত্য বলতে তিনি কখনো দ্বিধা করেন না, তা সে প্রশাসনেই হোক বা আন্তর্জাতিক ফোরামে। তাঁর কাজ করার ধরন প্রথাগত আমলাতন্ত্রের বাইরে। তিনি সরাসরি সমস্যার মূলে আঘাত করেন।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রমাণ করেছেন যে, সদিচ্ছা থাকলে এবং সততা সাথে থাকলে যত বড় চ্যালেঞ্জই আসুক না কেন, তা জয় করা সম্ভব। তিনি কেবল একজন উপদেষ্টা নন, তিনি পরিবর্তনের এক জীবন্ত ইশতেহার। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তাঁর উপস্থিতি একটি শক্তিশালী বার্তা দেয় যে—এখন সময় কেবল কাজের, এখন সময় অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার।

এএন