সংকটের দিকে ঝুঁকছে দেশের পাটশিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ১২:১৪ এএম
সংকটের দিকে ঝুঁকছে দেশের পাটশিল্প

কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাটকলগুলোতে উৎপাদন আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। মিলমালিকরা বলছেন, বাজারে পাটের সরবরাহ কম এবং দাম অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়েছে।

ফলে রপ্তানি আদেশ থাকলেও লোকসান এড়াতে অনেক কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন স্থগিত করেছে। খুলনা, যশোর, নরসিংদী ও সিরাজগঞ্জের বেশ কয়েকটি পাটকল সূত্রে জানা গেছে, গত এক মাসে কাঁচা পাটের দাম মণপ্রতি কয়েকশ থেকে হাজার টাকারও বেশি বেড়েছে। এতে সুতা ও পাটপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ধারিত দামে পণ্য সরবরাহ করতে গিয়ে মিলগুলো লোকসানে পড়ছে।

সরবরাহ সংকট ও বাজারে অস্থিরতা : পাট ব্যবসায়ীরা জানান, মৌসুম শেষ হওয়ার পর বাজারে কাঁচা পাটের সরবরাহ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। কিছু আড়তদার ও মজুতদার পাট ধরে রাখায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে খোলা বাজারে দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, বর্তমান দামে পাট কিনে উৎপাদন চালালে প্রতি টন পাটপণ্যে উল্লেখযোগ্য লোকসান গুনতে হচ্ছে। সংগঠনের এক নেতা বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে বাজার মনিটরিং জোরদার এবং প্রয়োজন হলে ন্যায্যমূল্যে পাট সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছি।’ রমজান উপলক্ষে মির্জা পার্থক্যকারীরূপে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তাই এ মাসের বিশেষত্ব অনেক বেশি।

তিনি বলেন, পবিত্র রমজান মাস ইবাদতের বিশেষ মওসুম। কারণ এই মাসে মানুষের গুণাহগুলোকে দূরীভূত করে তার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার ক্ষেত্র সৃষ্টি করে সিয়াম সাধনা। এ মাসের উদ্দেশ্য পাপ থেকে বিরত থাকা, ঈমান ও তাকওয়া অর্জন করা। রমজানে রোজা ও ইবাদতে আল্লাহর আশীর্বাদ বহুগুণে বর্ষিত হয়। বিএনপি মহাসচিব সংযমের মধ্য দিয়ে হিংসা-প্রতিহিংসা, অপরের অমঙ্গল কামনা, অশ্লীলতা আর পঙ্কিলতার আবর্ত থেকে মুক্ত হয়ে সমাজ জীবনে শান্তি, স্বস্তি ও ইনসাফ ফিরে আসার প্রার্থনা করেন। সবার সুখ-শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেন।

উৎপাদন বন্ধে শ্রমিক সংকট : পাটকলগুলোতে উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অনেক মিল আংশিক ছাঁটাই বা কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিয়েছে। শ্রমিকরা বলছেন, কয়েক দিন কাজ বন্ধ থাকলেই তাদের পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। খুলনার একটি বেসরকারি পাটকলের শ্রমিক জানান, ‘গত সপ্তাহে তিন দিন মিল বন্ধ ছিল। আমাদের দৈনিক মজুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে চললে সংসার চালানো কঠিন হবে।’

রপ্তানিতে প্রভাবের আশঙ্কা : বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রপ্তানি হয়। তবে কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন কমে গেলে রপ্তানি আদেশ পূরণে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট গুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ইতোমধ্যে কয়েকটি বিদেশি ক্রেতা সময়মতো পণ্য না পাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, সরবরাহ অনিশ্চিত হলে বিকল্প উৎসে ঝুঁকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ভারত ও নেপালের মতো দেশগুলোও পাটপণ্য রপ্তানিতে সক্রিয়। বাংলাদেশ যদি ধারাবাহিক সরবরাহ বজায় রাখতে না পারে, তাহলে বাজার হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

কৃষকের লাভ, মিলের লোকসান : বর্তমান পরিস্থিতিতে পাটচাষিরা ভালো দাম পাচ্ছেন- এটি ইতিবাচক দিক বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। তবে মিলমালিকরা বলছেন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে গিয়ে শিল্প যদি টিকে থাকতে না পারে, তাহলে সামগ্রিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে পাটের আবাদ কিছুটা কম হয়েছিল। পাশাপাশি বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় ফলনও কম হয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহ চাপের মুখে পড়েছে।

সরকারি পাটকল ও নীতিগত প্রভাব : রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পরিচালনা করে বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকারি মিলগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। উচ্চ দামে কাঁচা পাট কিনতে গিয়ে বাজেটের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। কিছু মিল সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পাট খাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব রয়েছে। কাঁচামালের মূল্য ওঠানামা সামাল দিতে কোনো স্থিতিশীল তহবিল বা মূল্য সহায়তা কাঠামো নেই। ফলে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেই শিল্প বিপর্যস্ত হয়।

মজুত ও মনিটরিং জোরদারের দাবি : পাটকল মালিকরা বাজারে মজুতদারি রোধে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো শিল্পে পড়ে। প্রয়োজন হলে সরকারি সংস্থা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট সংগ্রহ করে মিলগুলোতে সরবরাহ করতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে কৃষক ও মিলের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রস্তাবও দিয়েছেন অনেকে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কমবে এবং মূল্য স্থিতিশীল থাকবে বলে মনে করছেন তারা।

ব্যাংকঋণ ও আর্থিক চাপ : উৎপাদন বন্ধ থাকায় পাটকলগুলোর নগদ প্রবাহ কমে গেছে। ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে খেলাপি ঋণ বাড়তে পারে। এক মিলমালিক বলেন, ‘কাঁচামালের দাম বেড়েছে, উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে, কিন্তু ব্যাংকের সুদ তো থেমে নেই। এভাবে চললে শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন।’

বিকল্প পণ্যের দিকে ঝোঁক : বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের চাহিদা বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব ব্যাগ, কার্পেট ব্যাকিং ও জিও-টেক্সটাইল পণ্যে পাটের ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু কাঁচামালের অস্থির দাম শিল্পকে নিরুৎসাহিত করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক চাহিদা কাজে লাগাতে হলে কাঁচা পাটের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখা জরুরি। তা না হলে বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় বাজার হারাতে পারে।

সরকারের পদক্ষেপ : বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ টিমের মাধ্যমে আড়ত ও গুদামে নজরদারি বাড়ানো হবে। পাশাপাশি আগামী মৌসুমে পাটের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের প্রণোদনা দেয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন। বর্তমান সংকট দ্রুত না কাটলে বহু মিল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সর্বোপরি কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের পাটশিল্পকে গভীর সংকটে ফেলেছে। একদিকে কৃষক ভালো দাম পেলেও অন্যদিকে পাটকলগুলো উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

এতে শ্রমিক, রপ্তানিকারক ও ব্যাংকিং খাতসহ পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাজার মনিটরিং জোরদার, নীতিগত সহায়তা এবং সরাসরি কৃষক-মিল সংযোগ গড়ে তুলতে না পারলে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প বড় ধাক্কা খেতে পারে।

জেএইচআর