সাম্প্রতিক ঘটনায় ইরানের শাসনব্যবস্থা আগলে থাকার পরিবর্তে ভেঙে পড়েছে এমন সংবাদ নানা সংবাদ মাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে বিস্তারিত পরিস্থিতির নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে এমনকি ইংরেজি ও আন্তর্জাতিক সংবাদ উৎসগুলোও স্পষ্টভাবে বলছে যে, ইরান সরকারের শাসনব্যবস্থা এখনও ভেঙে পড়ে নাই, বরং কঠিন সংকট, রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং নেতৃত্বের শূন্যতা সত্ত্বেও দেশে রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে আছে এবং নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া বজায় রাখছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি : খামেনির মৃত্যু এবং শাসন কাঠামোর টেকসইতা
সামপ্রতিক বড় খবরগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু। মার্কিন ও ইসরাইলি আঘাতের কারণে দেশের সর্বোচ্চ ঊর্ধ্বতন নেতাকেই হারাতে হয়েছে।
ইরানের শাসন ব্যবস্থার মুখ্য ভিত্তি হলো একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র কাঠামো যেখানে সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্র ও সরকারের সব বড় নীতি, সামরিক ও নীতিনির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এই ব্যক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়েও ইরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারি নিয়ম, সামরিক শক্তি ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়।
খামেনির মৃত্যু রাষ্ট্রীয় শূন্যতা তৈরি করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদে উঠে এসেছে। তবে একই সাথে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শাসন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি কারণ এটি ব্র্যাকড কাঠামোয় রয়েছে যা দুর্যোগ অবস্থাতেও টিকে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি এখন একটি অস্থিতিশীল আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ ও অভ্যন্তরীণ নান্দনিক চাপের সমষ্টি, যেখানে নেতৃত্ব, আইনশৃঙ্খলা ও সুরক্ষা বাহিনী এখনও কার্যকারিতা বজায় রেখেছে।
জটিল ক্ষমতার কাঠামো : ভাঙা নাকি টিকে থাকা
ইরানের শাসনব্যবস্থা যদি শুধু একজন ব্যক্তির ওপর ভিত্তি করে থাকত, তবেখামেনির মৃত্যুতে রাষ্ট্র সহজেই ভেঙে পড়ত কিন্তু বাস্তবে বর্তমান রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে দেখা যায় ইরানের মধ্যে রয়েছে নানা স্তরের ক্ষমতার ছড়াছড়ি, যেমন-
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড করপস : ইরানের সশস্ত্র ও নীতিনির্ধারণী শক্তি হিসেবে আইআরজিসি দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা স্থিতি প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এই বাহিনীর সদস্যরা রাষ্ট্রীয় মানদণ্ড, সামরিক সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণে এখনও দৃঢ় অবস্থানে আছে।
সাময়িক নেতৃত্ব পরিষদ : সূত্রে জানা গেছে, খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের শাসনতন্ত্রে একটি তিন সদস্যের সাময়িক নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয়েছে, যার মধ্যে আছে প্রেসিডেন্ট, প্রধান বিচারপতি ও ধর্মীয় সদস্যরা। এই পরিষদ একটি মধ্যম সময়ের ব্যবস্থা, যাতে নতুন সুপ্রিম লিডার নির্বাচন পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হয়।
গার্ডিয়ান কাউন্সিল ও সংস্থাগুলোর ভূমিকা : ইরানের সংবিধান অনুযায়ী গার্ডিয়ান কাউন্সিল ও অ্যাসেম্বলি অব এক্সপের্টস মতাদর্শগত ভিত্তিতে শাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও পর্যালোচনায় অংশ নেয়, যা ইরানের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থাকে একটি কাঠামোগত টিকে থাকার উপাদান হিসেবে বিবেচিত।
এ কারণে, খামেনির মতো একজন ব্যক্তির মৃত্যু শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে অবিচ্ছেদ্য হলেও পুরো একটি সরকার বা প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি, বরং একটি ভিন্ন স্তরে পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও জনমতের বিভাজন : ইরানের সরকার ও শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক চাপের মুখোমুখি। বিশেষ করে ২০২৫-২৬ সালের কঠিন সময়টিতে দেশ জুড়ে হয়ে ওঠা অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব, কোভিড প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক বয়কট মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
শক্তি ও সহিংসতা বজায় রাখার ক্ষমতা : ইরানের সরকার বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ কৌশলের মাধ্যমে তাদের শক্তি ধরে রাখছে-
আইআরজিসি ও সিকিউরিটি বাহিনী কঠোরভাবে সড়ক, যোগাযোগ ও বিরোধী সংগঠন সমর্থন ব্যাহত করেছে।
মিডিয়া ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করে সরকার বিরোধীদলের সংগঠন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল করেছে।
রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় কাঠামো জনগণের মাঝে স্টেট ন্যারেটিভ প্রচারের মাধ্যমে বিরোধ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে।
এই সব উপাদান একসাথে মিলিয়ে এখনও ইরান একটি শৃঙ্খলা ও সমন্বিত শাসন কাঠামো টিকে থাকার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা শুধুমাত্র একক নেতা বা প্রশাসনিক ব্যক্তির মৃত্যুতে ভেঙে পড়েনি।
জনগণের মনোষত্ত্ব ও প্রভাব : খামেনির মৃত্যুর পর কিছু সময় সতর্কতা ও বিভাজন লক্ষ্য করা গেছে। কিছু মানুষ আনন্দ করেছে, অন্যরা উদ্বিগ্ন রয়েছে- যা দেশের সামাজিক বাস্তবতার জটিলতা বোঝায়।
এমন পরিস্থিতিতে শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আগেই একটি সত্য স্পষ্ট, জনগণের মধ্যে বিরোধ ও সমর্থনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও এখনও রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের ওপর সাধারণ জনগণের পরাধীনতা বা ভয় তৈরি রেখেছে এবং বড় পরিসরে বিক্ষোভ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়নি।
পরবর্তী চ্যালেঞ্জ, ভবিষ্যৎ সংকট : ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন একাধিক চাপের মুখে যাচ্ছে। যেমন-
অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অবস্থান ২. সামরিক ও বাহ্যিক শত্রুর চাপ, ৩. অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও সাংগঠনিক দুর্বলতা।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যদি এসব চাপ বিশেষত অভ্যন্তরীণ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ একত্রিত হয়, তবে শাসনব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে বর্তমানে এটি ভাঙার চেয়ে বরং ‘সংকট মোকাবিলা করে টিকে থাকা’ অবস্থায় রয়েছে।
সর্বোপরি, ভাঙা না হলেও ইরানের শাসনব্যবস্থা দিন কয়েক আগের মতো স্থায়ী নয়, বরং এটি একটি ভঙ্গুর স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে যা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কড়া চাপের মুখেও পতনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি আর ভবিষ্যতেও তা সহজে ভেঙে পড়বে এমনটি নিশ্চিত নয়।
লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত : উত্তর ইসরাইলের হাইফা শহরের কাই একটি সামরিক ঘাঁটিতে রকেট ও ড্রোন হামলা চালানোর পর লেবাননের রাজধানী বৈরুতে বোমাবর্ষণ করেই ইসরাইলি যুদ্ধবিমান। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালইর বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, এই বিমান হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত ও ১৪৯ জন আহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার ভোরে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লা জানায়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে তারা ইসরাইলে হামলা চালিয়েছে।
এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি বলে, প্রতিরোধ নেতৃত্ব সবই স্পষ্ট করেছে যে, ইসরাইলের আগ্রাসন অব্যাহত থাকা এবং আমাদের নেতা, তরুণ ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা আমাদের আত্মরক্ষার অধিকার দেয় এবং উপযুক্ত সই ও স্থানে জবাব দেয়ার বৈধতা দেয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পনেরো মাস ধরে চলা আগ্রাসন কোনো সতর্কতামূলক জবাব ছাড়া ইসরাইলি শত্রু চালিই যেতে পারে না; এই আগ্রাসন থামাতে এবং দখলকৃত লেবাননি ভূখণ্ড থেকে সরে যেতে তাকে বাধ্য করতেই এই পদক্ষেপ। এই সহিংসতা এমন এক সংঘাতের বড় ধরনের বিস্তারকে নির্দেশ করে, যা ক্রমেই এক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে- একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল, অন্যদিকে ইরান ও তার মিত্ররা।
হামলার পর দ্রুতই দক্ষিণ বৈরুতে বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, দক্ষিণ লেবাননের একাধিক গ্রাম ও দেশের পূর্বাঞ্চলের বেকা উপত্যকাতেও ইসরাইলি হামলা হয়েছে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা লেবাননজুড়ে জোরালোভাবে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। বাহিনীটি জানায়, এই অভিযানে যোগ দেয়ার হিজবুল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি তৈরি করা বা উত্তরের বাসিন্দাদের ক্ষতি করার সুযোগ সংগঠনটিকে দেয়া হবে না।
তারা আরও বলে, সন্ত্রাসী সংগঠন হিজবুল্লাহ লেবানন রাষ্ট্রকে ধ্বংস করই। উত্তেজনা বৃদ্ধির দায় তাদেরই এবং এই ক্ষতির জবাবে ইসরাইলি বাহিনী কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
ইরানের নেতারা যুদ্ধের চেয়ে ‘আত্মসমর্পণকে অনেক বেশি ভয় পান’ : কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পারসি মনে করেন, ইরানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কৌশল ছিল যত বেশি সম্ভব ঊর্ধ্বতন নেতাদের হত্যা করা, যতক্ষণ না পর্যন্ত কেউ আত্মসমর্পণ করে। তবে তিনি বলেন, এটি ছিল একটি ভুল হিসাব। আল জাজিরাকে পারসি বলেন, ট্রাম্প ভেবেছিলেন পারস্য উপসাগরে বিমানবাহী রণতরী নিই এলে এটি ইরানিদের এতটাই আতঙ্কিত করবে যে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।
কিন্তু তিনি এটি বুঝতে পারেননি যে, ইরান যুদ্ধের চেই আত্মসমর্পণকে অনেক বেশি ভয় পায়। এর কারণ, ইরানি সরকার বিশ্বাস করে তারা যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে কিন্তু আত্মসমর্পণের পর টিকে থাকতে পারবে না। আত্মসমর্পণ করবে এমন কাউকে খুঁজে পেতে হলে কেবল একের পর এক নেতৃত্ব স্তরের বিনাশ নয়, বরং সামগ্রিকভাবে দেশটিকে ধ্বংস করতে হবে, বলেন তিনি। সূত্র: আল জাজিরা
ইসরাইল-মার্কিন যৌথ হামলায় ইরানে নিহত বেড়ে ৫৫৫: ইরানে গত শনিবার ইসরাইলি-মার্কিন যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। গতকাল সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট।
এর আগে গত ১ মার্চ ২৪ ঘণ্টায় ইরানে ৫৭ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছিল রেড ক্রিসেন্ট। অন্যদিকে, ইরানের মিনাবে মেয়েদের একটি স্কুলে শনিবারের হামলার ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দেড়শ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটি। গত শনিবার সকালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বাসভবন লক্ষ্য করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে বড় ধরনের হামলা চালায়। এ হামলায় খামেনি নিহত হয়েছেন। গত রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, শনিবার খামেনির কম্পাউন্ডে চালানো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলায় তিনি নিহত হইইন।
বেশ কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে, নিশ্চিত করেছে কুয়েত : কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে গতকাল সোমবার সকালে বেশ কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে, তবে ক্রুরা নিরাপদ আছেন।
মন্ত্রণালয়টির দাপ্তরিক মুখপাত্র কর্নেল সৌদ আল আতওয়ান জানিয়েছেন, তাৎক্ষণিকভাবে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয় আর ক্রুদের সরিয়ে নিয়ে শারীরিক পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেয়া হয়। ক্রুদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল আই বলে জানিয়েছেন তিনি; খবর গাল্ফ নিউজের।
আতওয়ান আরও জানান, কুয়েতের কর্তৃপক্ষ ঘটনাগুলোর পরিস্থিতি নির্ধারণে সরাসরি মার্কিন বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করই এবং যৌথ প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করই। তদন্ত চলমান আই আর জনসাধারণকে তথ্যের জন্য সরকারি সূত্রগুলোর ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কুয়েত নিশ্চিত করার আগে ইরান একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান গুলি করে ফেলে দেয়ার দাবি করে সেটির কথিত ভিডিও অনলাইনে শেয়ার করেছিল। ওই ভিডিওতে একটি যুদ্ধবিমানকে ঘুরে ঘুরে নিচে পড়ে যেতে দেখা গেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা গতকাল সোমবার তৃতীয় দিনে গড়ানোর পর এ দাবি জানিইই তেহরান।
নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে হামলার দাবি ইরানের : তেল আবিবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়, হায়েফার বিভিন্ন নিরাপত্তা ও সামরিক কেন্দ্র এবং পূর্ব জেরুজালেমে হামলা চালানোর দাবি করেই ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী আইআরজিসি।
এই প্যারামিলিটারি বাহিনীটে আগে সরাসরি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অধীনে ছিল। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার শুরুতেই ইরানের এ সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নিহত হন। “জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠীর বদমাশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং ওই শাসকগোষ্ঠীর বিমান বাহিনী কমান্ডারদের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হামরা চালানো হয়েছে, গতকাল সোমবার ইরানি বার্তা সংস্থা ফারসে তাদের এই বিবৃতিটি প্রকাশ করে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।
ইসরাইলে এদিনের হামলায় খাইবার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহূত হয়েছে বলেও বিবৃতিতে জানিয়েছে তারা। তবে তাদের হামলার দাবির প্রসঙ্গে এখনও ইসরাইলের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, বলেছে রুশ সংবাদমাধ্যম প্রাভদা। গতকাল সোমবার জেরুজালেমের ওপর একাধিক নতুন বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে প্যারিসভিত্তিক একটি বার্তা সংস্থার সাংবাদিক জানিয়েছেন। তার আগে ইসরাইলের সামরিক বাহিনীও তাদের লক্ষ্য করে ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা জানিয়েছিল।
আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করব না লারিজানি : ইরানের শীর্ষ রাজনীতিক এলহাম আলিরেজা লারিজানি গত সোমবার একাধিক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসব না।’ এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি আবার নতুন করে উত্তেজনার দিকে ধাবিত হয়েছে।
লারিজানির ঘোষণার পটভূমি : সামপ্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে, যেখানে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিরোধী গোষ্ঠীগুলো এবং আইআরজিসি যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তোলার কারণে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেছে। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটেই ক্রমশ ইরান আলোচনার পরিবর্তে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার নীতি গ্রহণ করেছে।
লারিজানি বলেন, ‘সংঘাতের ক্ষেত্রে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো রকম আলোচনায় বসতে চাই না। আমরা স্বায়ত্তশাসন ও সুরক্ষা বিষয়ক সংকটগুলো নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সমাধান করব।’ এমনকি তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক হুমকি হিসাবে অভিহিত করেছেন, যা ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ।
বক্তব্যের সময় ও আঙ্গিক : লারিজানি একাধিক টেলিভিশন আলোচনা ও জার্নালিস্টদের প্রশ্নের উত্তরে এই কঠিন অবস্থান পুনরায় নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন,ইরান ‘স্বাধীন আলোচনা ও কূটনৈতিক আস্থার শর্তে’ কথা বলতে চায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কৌশল ও আচরণ এ রকম আলোচনা শক্ত করে তোলে। ‘সহজ আলোচনার আগেই নির্দিষ্ট শর্ত বাতিল করা হবে না’-এটাই ইরানের নীতিমালা।
এ সাক্ষাৎকারটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে লাইভ সমপ্রচার হয় এবং অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ইরানের জোরালো কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া।
কেন ইরান আলোচনায় আগ্রহী নয় : ইরানের কঠিন অবস্থানের পেছনে আছে কিছু নীতিগত এবং বাস্তব কারণ। যেগুলো ব্যাখ্যা করে কেন তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় যেতে নারাজ—
ইতিহাসগত বিশ্বাসঘাতকতা : ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র অতীতে ইরানের বিরুদ্ধে একাধিক প্রচেষ্টায় বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ঔঈচঙঅ থেকে বের হয়ে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনে। অর্থনৈতিক চাপ ও বাণিজ্য অবরোধ ইরানের অর্থনীতিকে কঠিন মন্দায় ডোবায়। ইরানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
এই ইতিহাস ইরানকে মনে করিয়ে দেয়, কেন তারা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আলোচনাকে অবিশ্বস্ত মনে করে।
ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিরাপত্তা : ইরান মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসলে তাদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হবে এবং তারা বাইরে থেকে চাপের মুখে নীতিগতভাবে ছমছমে লাগবে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ : ইরানের জনগণ ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী অনেক অংশে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আলোচনার বিরোধী, বিশেষত সন্ত্রাসবিরোধী নীতির প্রশ্নে। এর ফলে ইরানের নেতৃত্ব মনে করে, ‘অন্তর্নিহিত ভিত্তি না থাকলে সরাসরি আলাপ করা স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়।’
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ : লারিজানির বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি প্রাথমিক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা ইরানের অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছি, তবে আলোচনার দরজা সবসময়ই খোলা। কিন্তু সাহায্যপ্রাপ্ত পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার ব্যাপারে তাদের পূর্ণ অসমর্থ বা অস্বীকৃতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে বিপথগামী করতে পারে।’ যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, তারা অবিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক সুযোগ রেখেছে, তবে ইরান রাজনৈতিক কারণে সরাসরি আলোচনায় আগ্রহী নয়।
অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রভাব : ইরানের কঠোর অবস্থান শুধুমাত্র রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রভাব তৈরি করছে না, এটির অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বব্যাপী লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন-
তেলের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে- বিশেষত যখন তেলের উৎপাদনকারী দেশগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে।
রপ্তানি-আমদানি সম্পর্কিত বাজারপন্থি সিদ্ধান্তগুলো স্থগিত বা অনিশ্চিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘ইরানের একটি কঠিন অবস্থান এবং আলোচনা থেকে বিরত থাকার নীতি এথিক্যাল নয়, বরং এটি গবেষণাধর্মী এবং পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতিতে স্থিতিস্থাপকতার একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা।’ এ কারণে বিশ্ব ব্যাংক ও আর্থিক সংস্থা সতর্ক করে দিয়েছে যে এই পরিস্থিতি বিশ্ব বাজারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সবমিলিয়ে পুরো বিশ্বকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বমুখী দ্বন্দ্বের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন