অবরুদ্ধ আকাশপথ, পর্যটনে ধস

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০২৬, ১২:১৩ এএম
অবরুদ্ধ আকাশপথ, পর্যটনে ধস

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ ও সামরিক উত্তেজনার পারদ এখন ইতিহাসের এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে। ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা ও ড্রোন যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই অঞ্চলের আকাশপথ ও পর্যটন শিল্পে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতের মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোর পর এবার এই মহাবিপর্যয়ে যুক্ত হয়েছে বাহরাইন।

৩ মার্চ ২০২৬-এ প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, পুরো মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে এক নজিরবিহীন ‘এভিয়েশন এবং মোবিলিটি’ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আকাশপথ বন্ধ নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি এবং বিভিন্ন দেশের জারি করা উচ্ছেদ সতর্কবার্তা সম্মিলিতভাবে এই অঞ্চলের পর্যটন প্রবাহকে পঙ্গু করে দিয়েছে। যা একসময় করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিল, তা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

১. বাহরাইন: কৌশলগত অবস্থান ও স্থলপথের অস্থিরতা

বাহরাইনের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সৌদি আরবের সাথে সংযোগকারী ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কিং ফাহদ কজওয়ে বর্তমানে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির কেন্দ্রে।

স্থলপথের সংকট: কজওয়ের কাছে ড্রোন সংক্রান্ত নিরাপত্তা ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে মানুষের যাতায়াত এবং সপ্তাহান্তের পর্যটন স্থবির হয়ে পড়েছে।

আকাশপথ ও বিমানবন্দর: বাহরাইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বর্তমানে মিসাইল ইন্টারসেপশনঅ্যালার্টের কারণে সাময়িক কার্যক্রম স্থগিত রাখছে। এর ফলে মানামায় পূর্বনির্ধারিত বড় বড় করপোরেট কনফারেন্স এবং স্পোর্টিং ইভেন্টগুলো স্থগিত করা হয়েছে।

আর্থিক প্রভাব: বিলাসবহুল হোটেলের বুকিং বাতিল এবং রিটেইল সেক্টরে রাজস্বের ব্যাপক ঘাটতি বাহরাইনের ছোট আকারের পর্যটন অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।

২. সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই): বিশ্বের ট্রানজিট হাবে বিপর্যয়

দুবাই এবং আবুধাবিযা বিশ্বের আকাশপথের অন্যতম প্রধান সংযোগস্থল, সেখানে যুদ্ধের ছায়া সবচেয়ে দীর্ঘ।

রুট ডাইভারশন: ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যবর্তী ফ্লাইটগুলোকে এখন বিপদজনক এলাকা এড়াতে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ফ্লাইটের সময় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বেড়ে গেছে।

বিদেশের উচ্ছেদ সতর্কবার্তা: ইউএই-তে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য নিজ নিজ দেশ থেকে ‘ইভাকুয়েশন অ্যাডভাইজরি’ জারি করায় পর্যটক আসার চেয়ে দেশ ছাড়ার হিড়িক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ক্রুজ শিপ বা প্রমোদতরিগুলো তাদের পূর্বনির্ধারিত রুট থেকে মধ্যপ্রাচ্যকে বাদ দিচ্ছে।

৩. সৌদি আরব: হজযাত্রা ও পরিকাঠামো সংকট

সৌদি আরবের পর্যটন মূলত ধর্মীয় তীর্থযাত্রার (ওমরাহ ও হজের প্রস্তুতি) ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান অস্থিরতা এই ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

ওমরাহ যাত্রীদের বিড়ম্বনা: আকাশপথ সংকুচিত হওয়ায় মক্কা ও মদিনাগামী হাজারো ওমরাহ যাত্রী মাঝপথে আটকা পড়েছেন।

সীমান্ত নিরাপত্তা: বিমানবন্দর এবং স্থল সীমান্তগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা তল্লাশির কারণে যাত্রী প্রক্রিয়াকরণে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। পর্যটন সংস্থাগুলো নতুন করে কোনো বুকিং নিতে সাহস পাচ্ছে না।

৪. লেবানন ও জর্ডান: পর্যটনে চরম ধস ও অস্তিত্বের সংকট

লেবানন এবং জর্ডানের মতো দেশগুলো, যারা মূলত সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল, তারা এখন পর্যটক শূন্য হয়ে পড়েছে।

  • লেবানন: বৈরুত বিমানবন্দরে নিয়মিত বিরতিতে ফ্লাইট স্থগিত রাখা হচ্ছে। ইউরোপীয় পর্যটকরা তাদের বুকিং বাতিল করেছেন এবং বিমা কোম্পানিগুলো লেবাননকে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
  • জর্ডান: জর্ডান সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না থাকলেও পার্শ্ববর্তী দেশের সংঘাতের প্রভাবে পেট্রো, মৃত সাগর (উবধফ ঝবধ) এবং আম্মানে পর্যটক সমাগম শূন্যের কোঠায় নেমেছে। বিদেশি সরকারগুলোর ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি জর্ডানের পর্যটন অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

৫. কাতার ও কুয়েত: নিরাপত্তা ও ট্রানজিট সংবেদনশীলতা

  • কাতার: হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ বিমানবন্দর হলেও রুট পরিবর্তনের কারণে শিডিউল বিপর্যয় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রিমিয়াম ট্রানজিট যাত্রীরা এখন কাতার এয়ারওয়েজ এড়িয়ে অন্য রুট খুঁজছেন।
  • কুয়েত: কুয়েত তার বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং বাণিজ্যিক ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়িক ভ্রমণ বা করপোরেট ট্রাভেল ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

৬. আঞ্চলিক এভিয়েশন ও পর্যটন সংকটের সারসংক্ষেপ

৭. সামগ্রিক অর্থনৈতিক ফলাফল ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা

পুরো মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন স্থাপত্য একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। যখন একটি দেশের আকাশপথ বন্ধ হয়, তখন পার্শ্ববর্তী দেশের রুটে ট্রাফিক জ্যাম তৈরি হয়।

বিমা দাবির পাহাড়: ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স বা ভ্রমণ বিমার দাবি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

বিলাসবহুল হোটেলের লোকসান: জিসিসি (এঈঈ)ভুক্ত দেশগুলোর পাঁচ তারকা হোটেলগুলোতে এখন শুনশান নীরবতা।

খুচরা ব্যবসা: বিমানবন্দর সংলগ্ন ডিউটি-ফ্রি এবং শপিং মলগুলোতে রাজস্ব আদায় প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে।

৮. পুনরুদ্ধারের পথ ও উত্তরণের উপায়

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণ কেবল তখনই সম্ভব যদি খুব দ্রুত ডি-এস্কেলেশন বা যুদ্ধবিরতি ঘটে। আকাশপথ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটন খাতের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকা থেকে আসা পর্যটকদের আশ্বস্ত করতে জিসিসি দেশগুলোকে সমন্বিত ‘নিরাপত্তা প্রচারণা’ চালাতে হবে।

যদি সংঘাত দ্রুত প্রশমিত হয়, তবে আটকে থাকা চাহিদার কারণে পর্যটন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু যদি এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাত মাঝারি মেয়াদে এক বিশাল মন্দার কবলে পড়বে।

ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই ত্রিমুখী সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে কেবল একটি সামরিক রণাঙ্গনে পরিণত করেনি, বরং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান পর্যটন ও এভিয়েশন করিডোরকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বর্তমানে এই অঞ্চলের পর্যটন খাত এখন ‘রিক্যালিব্রেশন’ বা নতুন করে গুছিয়ে নেয়ার লড়াইয়ে লিপ্ত। একদিকে উচ্ছেদ অভিযান সামলানো আর অন্যদিকে অনিশ্চয়তার মাঝে টিকে থাকা্তএই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখেই এখন দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য।