বাংলাদেশ রেলওয়ের পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিন, সীমিত লোকমোটিভ এবং শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিদিনের বিলম্ব, বাতিল ট্রেন এবং নিরাপত্তাহীন পরিবেশ যাত্রীদের যাত্রা কঠিন করে তুলছে, যা দেশের দূরপাল্লার ও স্থানীয় ট্রেন সেবার কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশে রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশের গণপরিবহন খাতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এবং টন টন পণ্য দেশের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলকে সংযুক্ত করে। কিন্তু বর্তমানে রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকট এবং ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিনের ব্যবহার দেশের রেল পরিবহনকে স্থবিরতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতিদিন চলমান হাজার কিলোমিটারের রেল নেটওয়ার্কে ইঞ্জিনের অভাব এবং পুরনো, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ছে। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে এই সংকট তীব্র।
ইঞ্জিনের সংখ্যা কমছে, ঝুঁকি বাড়ছে
১৯৬৯-৭০ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে মোট ইঞ্জিন সংখ্যা ছিল ৪৮৬টি। স্বাধীনতার পর ৫৫ বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র দুই শতাধিক। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ, যা প্রায় কোনও রকম রক্ষণাবেক্ষণ বা সার্ভিসের মধ্য দিয়ে চলছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের দূরপাল্লার ট্রেন যেমন কর্ণফুলি এক্সপ্রেসই তার উদাহরণ। যাত্রীরা ট্রেনের গতি এবং সুরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ট্রেনের ইঞ্জিনের অনেক যন্ত্রাংশ্তযেমন চালকের হাতে থাকা ব্রেক, পায়ের কাছে থাকা ডেডম্যাল ফুট প্যাড, এবং গতি পরিমাপক মিটার্তঅকার্যকর। ফলে চালকরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ট্রেন চালাচ্ছেন।যাত্রীদের ভোগান্তি এবং বিলম্ব
প্রায় প্রতিদিন পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে ৩-৪টি ট্রেন বিলম্বিত হচ্ছে। কখনও কখনও ট্রেন বাতিলও হতে দেখা যায়। যাত্রীদের জন্য এই বিলম্ব মানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, ভ্রমণ পরিকল্পনা বিঘ্নিত হওয়া, এবং অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতি। ঢাকা বিমানবন্দর রেলস্টেশন মাস্টার শাহাদাত হোসেন বলেন, “ইঞ্জিন সংকটের কারণে প্রতিদিন ট্রেন বিলম্ব হচ্ছে। যাত্রীদের অসুবিধা হচ্ছে। তাদের সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের সীমিত ইঞ্জিন দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে, ফলে শিডিউল বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং।”
নতুন ইঞ্জিন কেনার প্রয়োজনীয়তা
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন্তযদি পরবর্তী এক বছরের মধ্যে কমপক্ষে ৫০টি নতুন ইঞ্জিন না কেনা হয়, তাহলে সার্বিক রেল সেবা হুমকির মুখে পড়বে। রেল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, “৩০০০ কিলোমিটার রেল নেটওয়ার্কে সেবা দিতে যেসব লোকমোটিভ প্রয়োজন, তার মাত্র ৫০ শতাংশ আছে। এবং এই ৫০ শতাংশের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। তাই দ্রুত নতুন ইঞ্জিন কেনার ব্যবস্থা করা জরুরি।”
এছাড়া, পুরনো ইঞ্জিনে অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, ফিউয়েল কার্যকারিতা কমে যাওয়া, এবং যাত্রী সেবার মান হ্রাস্তএসবও দেশের রেল খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
রেলওয়ের পদক্ষেপ: নতুন ইঞ্জিন আনা
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, নতুন ইঞ্জিন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এডিবি অর্থায়নে ৩০টি এবং এআইআইবির অর্থায়নে ৩০টি ইঞ্জিন আনার জন্য ডিপিপি প্রণয়ন চলছে। মোট ৬০টি নতুন ইঞ্জিনের মাধ্যমে পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিনগুলোকে বদলানো হবে এবং রেল সেবা পুনরায় সচল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার আগে দেশব্যাপী রেল নেটওয়ার্কে যাত্রী এবং পণ্যের চলাচলকে কতটা স্থিতিশীল করা সম্ভব, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিনে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা
ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিনের ব্যবহার শুধুই বিলম্ব নয়, বরং বড় দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও তৈরি করছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার ট্রেনে যাত্রী নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে। ঝুঁকিগুলো হল-
- ব্রেক সিস্টেম বিকল হলে ট্রেন থামাতে বিলম্ব হতে পারে।
- গতি পরিমাপক মিটার না থাকায় চালকরা গতি নিয়ন্ত্রণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
- পুরনো ইঞ্জিনে ফিউয়েল কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় বড় দূরত্বে ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।
- ট্রেন চালক এবং রেলওয়ের কারিগররা সারা দিন এই ঝুঁকির মুখোমুখি থাকেন।
শিডিউল বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশে ৩ হাজার কিলোমিটার রেলপথে প্রতিদিন ৩২৫টি ট্রেন চলাচল কর্তেযাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে পণ্যবাহী, আন্তঃনগর, লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন।
ইঞ্জিন সংকটের কারণে এই ট্রেনগুলোর শিডিউল বিপর্যয় ঘটে। পণ্যবাহী ট্রেন বিলম্বিত হলে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে চিনি, সিরামিক, খাদ্যদ্রব্য, এবং অন্যান্য শিল্পজাত পণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। অতএব, ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিন শুধু যাত্রীদের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
যাত্রী ও চালকের দৃষ্টিকোণ থেকে রেলওয়ে
যাত্রীদের ভোগান্তি এখন সাধারণ জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর ট্রেন কখনও বাতিল, কখনও বিলম্বিত। এক যাত্রী বলেন, “প্রতিদিনের ভ্রমণ এখন এক ধরনের দুশ্চিন্তা। সময়মতো কাজ বা স্কুলে পৌঁছানো কঠিন হচ্ছে। কিছুতেই নির্ভরযোগ্য সেবা পাচ্ছি না।” চালকেরা বলেন, যাত্রীর জীবন নিরাপদ রাখতে গিয়ে নিজেও ঝুঁকিতে থাকেন। ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিনে দীর্ঘ সময় ধরে ট্রেন চালানো মানে মানসিক চাপও বাড়ছে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ এবং সমাধান
বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য তাৎক্ষণিক সমাধান হলো:
- দ্রুত ৫০-৬০টি নতুন ইঞ্জিন আনা।
- পুরনো ইঞ্জিনের পুনর্বহাল ও রক্ষণাবেক্ষণ বাড়ানো।
- কারিগরি বিভাগকে শক্তিশালী করা।
- শিডিউল ও যাত্রী সেবা মেইনটেন করা।
ঝুঁকিপূর্ণ প্রয়োজনীয় অংশগুলো (ব্রেক, ফুট প্যাড, গতি মিটার) দ্রুত আপগ্রেড করা।
এছাড়া, দীর্ঘমেয়াদে ইঞ্জিনের স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন।
সর্বোপরি, বাংলাদেশ রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকট শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয় এটি দেশের গণপরিবহন, অর্থনীতি এবং জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিনে ট্রেন চালানো, শিডিউল বিপর্যয় এবং বিলম্বিত পণ্যবাহী ট্রেন এসব কেবল বর্তমান সমস্যা নয়, ভবিষ্যতের জন্যও সংকেত বহন করছে। নতুন ইঞ্জিন আনা, কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ বৃদ্ধি, এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশ পরিবর্তন না করা পর্যন্ত, দেশের রেলযাত্রা নিরাপদ এবং কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত। “প্রতিদিনের যাত্রা এখন আর আনন্দের নয় এটি এক ধরনের পরীক্ষা। যাত্রীরা নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা এখন সংশ্লিষ্টদের জন্য চ্যালেঞ্জ।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন