চলমান এক মৃত্যুফাঁদ ‘লেগুনা’

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: এপ্রিল ৭, ২০২৬, ১২:১৩ এএম
চলমান এক মৃত্যুফাঁদ ‘লেগুনা’

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে প্রতিদিনই চোখে পড়ছে এক নতুন হুমকি অবৈধ যানবাহন দৌরাত্ম্য, যা স্থানীয়রা ভয়ঙ্করভাবে ‘লেগুনা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। আইনভঙ্গকারী এসব যানবাহন না শুধু যানজট বৃদ্ধি করছে, বরং সাধারণ পথচারী ও সড়ক ব্যবহারকারীদের জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ছোট-বড়, ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক যে কোনো ধরনের যানবাহন যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সড়কে একেবারে অচল প্রহরীর মতো আচরণ করছে। সকাল-বিকেলের ব্যস্ত সময়ে এই দৌরাত্ম্যের মাত্রা আরও বাড়ে।

ট্রাফিক সিগনাল অমান্য, সড়কের একাধিক লেন অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, হঠাৎ বাঁক বা বিপরীত দিক থেকে আসা অবৈধ গাড়ি- সব মিলিয়ে এক চিত্র, যা প্রত্যেক পথচারীর হূদয়কে হিম হয়ে যেতে বাধ্য করে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ‘লেগুনা’র মতো এই অবৈধ গাড়ির দৌরাত্ম্যে ছোট ছোট দুর্ঘটনা এখন প্রতিদিনের ঘটনা। সামপ্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব লেগুনার বড় অংশই আসলে বৈধ যান নয়; বরং এগুলো তৈরি হয়েছে পুরোনো মাইক্রোবাস বাপিকআপ কেটে-ছেঁটে অবৈধভাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত গাড়ি ও পথচারী নিরাপত্তা তদারকি না থাকলে এই সমস্যা বড় রূপ নিতে পারে। সরকারি সংস্থা ও ট্রাফিক পুলিশকে সতর্ক হতে হবে, কারণ প্রতিটি অবহেলা এই ‘লেগুনা’র ভয়কে আরও গভীর করছে।

নথিতে এক, বাস্তবে আরেক : ইধহমষধফবংয জড়ধফ ঞৎধহংঢ়ড়ৎঃ অঁঃযড়ৎরঃু-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে নিবন্ধিত অনেক যানবাহন রয়েছে যেগুলো মাইক্রোবাস বা পিকআপ হিসেবে তালিকাভুক্ত। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো রাস্তায় চলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে- লেগুনা বা হিউম্যান হলার হিসেবে। নম্বরধারী কিছু যানকে বাইরে থেকে দেখলে সহজেই লেগুনা মনে হবে। অথচ নথিতে এগুলো ভিন্ন ক্যাটাগরির যান। এই অসামঞ্জস্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে বড় ধরনের জালিয়াতির, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখের সামনে ঘটছে।

কীভাবে তৈরি হচ্ছে ‘মৃত্যুফাঁদ’ : অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ভাঙ্গাপ্রেস ও কেনাপাড়া এলাকায় গড়ে উঠেছে অবৈধ ওয়ার্কশপের নেটওয়ার্ক। এখানেই পুরোনো ও অকেজো যানবাহনকে নতুন রূপ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এসব লেগুনা। প্রক্রিয়াটি সাধারণত এমন- পুরোনো মাইক্রোবাস বা পিকআপ সংগ্রহ করা হয়, গাড়ির বডি কেটে নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়, অতিরিক্ত সিট বসানো হয়, বাহ্যিক রং ও ডিজাইন দিয়ে লেগুনার চেহারা দেয়া হয়।

কারিগরদের ভাষ্য অনুযায়ী- বডি তৈরি করতে খরচ প্রায় ৫০ হাজার টাকা, সিট বসাতে লাগে ১০ হাজার টাকা, রং ও অন্যান্য খরচ আলাদা। অল্প খরচে বেশি আয় সম্ভব হওয়ায় এই ব্যবসা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।

ফিটনেসবিহীন ঝুঁকি : এসব যানবাহনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- এগুলোর কোনো বৈধ ফিটনেস নেই। মূল কাঠামো পরিবর্তনের ফলে গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট হয়, ব্রেকিং সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনার সময় বডি সহজেই ভেঙে যায়, যাত্রীদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা থাকে না, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। ফলে সামান্য সংঘর্ষও বড় দুর্ঘটনায় পরিণত হতে পারে।

সড়কে নৈরাজ্য : শুধু অবৈধ নির্মাণই নয়, এই লেগুনাগুলোর চলাচলও বিশৃঙ্খল। সাধারণ অভিযোগগুলো হলো- অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, নির্ধারিত ভাড়া না মানা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা।

যাত্রীরা জানান, স্বল্প দূরত্বের ভাড়া ১০ টাকা হলেও অনেক সময় তা ২০-৩০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। জ্যাম বা পরিস্থিতির অজুহাতে ভাড়া বাড়ানো হয় ইচ্ছামতো। মামুন নামে এক যাত্রীর ভাষায়, ‘গাদাগাদি করে বসতে হয়, কিন্তু বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে উঠি।’

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন : রাজধানীতে এই অবৈধ যানবাহনের অবাধ বিচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও। বিশেষ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ- এর ট্রাফিক বিভাগের কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিসুর রহমান স্বীকার করেছেন, এসব লেগুনার অধিকাংশই কাগজপত্রবিহীন। তার মতে, ‘স্থানীয় চাহিদার কারণেই এগুলো চলছে। সব সমস্যার সমাধান শুধু ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়।’ এই বক্তব্যে একদিকে বাস্তবতা উঠে এলেও অন্যদিকে দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতার অভিযোগও উঠেছে।

কেন থামছে না এই প্রবণতা : বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েকটি কারণে এই অবৈধ ব্যবস্থা থামছে না- ১. উচ্চ চাহিদা: ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে স্বল্প খরচে দ্রুত চলাচলের জন্য লেগুনার চাহিদা বেশি। ২. দুর্বল নজরদারি: নিয়মিত অভিযান না থাকায় অবৈধ যান সহজেই চলাচল করছে। ৩. দুর্নীতি: কিছু ক্ষেত্রে ঘুষের মাধ্যমে আইন প্রয়োগ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। ৪. বিকল্পের অভাব: পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে এসব ঝুঁকিপূর্ণ বাহন ব্যবহার করছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, এই পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। তার মতে- গাড়ির কাঠামো ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা গুরুতর অপরাধ, সিট পুনর্বিন্যাস করলে নিরাপত্তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়, এভাবে চলতে থাকলে এটি ভবিষ্যতে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হবে। তিনি আরও বলেন, সড়কে সুশাসনের অভাবই এই অনিয়মের মূল কারণ।

পরিসংখ্যান বনাম বাস্তবতা : ইধহমষধফবংয জড়ধফ ঞৎধহংঢ়ড়ৎঃ অঁঃযড়ৎরঃু-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে অনুমোদিত হিউম্যান হলারের সংখ্যা ৪,৭৫২টি। কিন্তু বাস্তবে রাস্তায় চলাচলকারী লেগুনার সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। এই ব্যবধানই প্রমাণ করে- বিপুল সংখ্যক যান অবৈধ, নিবন্ধন ও তদারকিতে বড় ঘাটতি রয়েছে, আইন প্রয়োগ কার্যকর নয়, জননিরাপত্তা বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞরা কিছু করণীয় প্রস্তাব করেছেন- ১. কঠোর অভিযান: অবৈধ লেগুনা জব্দ ও ধ্বংস করতে হবে। ২. ফিটনেস যাচাই: সব যানবাহনের নিয়মিত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. গণপরিবহন উন্নয়ন: বিকল্প হিসেবে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। ৪. জনসচেতনতা: ঝুঁকিপূর্ণ যান এড়িয়ে চলতে মানুষকে সচেতন করতে হবে। ৫. জবাবদিহি নিশ্চিত করা: প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে।

সর্বোপরি, রাজধানীতে অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য শুধু যানজট তৈরি করছে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনকে ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। ছোট-বড় দুর্ঘটনার হার বেড়ে যাওয়া এবং পথচারী ও চালকদের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টির ফলে জননিরাপত্তা যে হুমকির মুখে আছে, তা স্পষ্ট।

সমস্যা শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবে নয়, বরং যথাযথ তদারকি ও আইন প্রয়োগের ঘাটতির কারণে আরও গভীর হচ্ছে। তাই অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর ট্রাফিক আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। সরকার, ট্রাফিক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই পরিস্থিতি প্রতিদিন নতুন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। নাগরিকদের জীবন ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন, নয়তো ‘দৌড়মান লেগুনা’র ভয় মানুষকে প্রতিনিয়ত আতঙ্কিত করবে।