গুম হত্যার আইনি সুযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ১২:০৮ এএম
গুম হত্যার আইনি সুযোগ

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজ করা ব্যক্তিদের বিচারের পথ আইনিভাবে সুসংহত করা হলো। জাতীয় সংসদে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’ বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে পাস হয়েছে। এই বিল সংশোধনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনসমূহে গুমকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা বাংলাদেশে গুমের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দিক দিয়ে একটি ঐতিহাসিক ধাপ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

এদিন সংসদ অধিবেশনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বিলটি পেশ ও ব্যাখ্যা করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন এবং দ্রুত কণ্ঠভোটের মাধ্যমে এই সংশোধনী বিলটি অনুমোদন দেয়া হয়।

গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে যে সংজ্ঞা পেশ হয়েছে : আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘গুম অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিকে জোর করে তুলে নেয়া, তাকে সরকারি বা অ-সরকারি কোনো বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রেখে তার স্বজনদের খবর না থাকা- এখন থেকে ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় একটি স্পষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।’ এই সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। এর আগে বাংলা ভাষায় গুমকে আইনি প্রেক্ষাপটেমানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

অথচ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও সমালোচকরা বহুদিন ধরেই বলছেন, যেখানে কোনো ব্যক্তিকে দণ্ডহীনভাবে অদৃশ্য করা হয়, তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবেই গণ্য হওয়া উচিত। বর্তমান সংশোধনীর মাধ্যমে এটি অবশেষে আইনগত ভিত্তিতে স্থির করা হলো।

কেন এই সংশোধনীর প্রয়োজন : বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ সময় বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর অদৃশ্য করতে নেয়া, পরে লাশ বা কোনো সূত্র না পাওয়া- এসব ঘটনার ফলে ন্যায়বিচার দাবির আওয়াজ দীর্ঘদিন ধরে ছিল।

যদিও সরকার বারবার বলেছে, যারা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে, প্রত্যেকটি অভিযোগ গুরুত্বসহকারে দেখা হবে, তবুও আইনি সংস্কারের আর্কিটেকচার তৈরির অভাবে কার্যকর হত্যা/গুম-সম্পর্কিত বিচার অনেক সময় আটকে ছিল।

এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো একটি আদালতের মাধ্যমে গুম ইস্যুতে বিচার কার্যক্রম শুরু করার জন্য আইনি ভিত্তি নির্মাণ অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছিল। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস অ্যাক্টে দীর্ঘদিন ধরে গুম অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তাই অনেক মামলার আইনি কাঠামো যথাযথভাবে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছিল না।

আইনমন্ত্রী এর পেছনের যুক্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘যদিও ট্রাইব্যুনাল আইনের মূল লক্ষ্য ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধ, যেমন- যুদ্ধাপরাধ; তারই অংশ হিসেবে আজ আমরা গুমকে অন্তর্ভুক্ত করছি। এটি কোনো রাজনৈতিক সফর নয়, এটি বাংলাদেশের নাগরিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি স্থায়ী পদক্ষেপ।’

সংসদীয় বিভাজন ও বিরোধীদলের প্রতিক্রিয়া : বিল পাসের পর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলের নেতৃত্বে থাকা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময় যখন আসবে, তখন আলোচনায় আমরা অংশগ্রহণ করব। এই মুহূর্তে আর কিছু বলতে চাই না।’

স্পিকারের ভাষ্য ছিল, ‘ম্যাডাম বা মন্ত্রী- আপনি সংসদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকুন, বাইরে যাদের মতামত আছে, তাদের কথা এখানে বিবেচনার প্রয়োজন নেই। আমাদের নিয়ম অনুযায়ী কার্যক্রম চলছে।’

এই মন্তব্যের মাধ্যমে স্পিকার স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সংসদীয় প্রক্রিয়া ও নিয়মের মধ্যে থেকে কোনো বিষয় আলোচিত হবে, বাড়তি পোস্টারিয়র বিতর্ক বা গণজোয়ার এখানে প্রাধান্য পাবে না। এটি সংসদের কার্যকারিতা ও নিয়ম-কানুনের প্রতি একটি কঠোর মনোভাব প্রকাশ করে।

সংশোধনী বিলটির মূল পয়েন্টগুলো : ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬-এর মূল আকৃতি ও সংশ্লিষ্ট ধারা অন্তর্ভুক্ত করে।

গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের শ্রেণীবদ্ধকরণ : গুমকে আইনের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে যাতে করে সেই সব ঘটনার বিচার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মানদণ্ড অনুযায়ী করা যায়। এর ফলে এ ধরনের অভিযোগে অপরাধীরা দণ্ডিত হতে পারবে মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামি হিসেবে।

ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ার জন্য একটি নির্ধারিত কাঠামো : আইনের আওতায় প্রতিটি গুম ইস্যুতে তদন্ত, সাক্ষ্য গ্রহণ, প্রমাণ উপস্থাপন এবং বিচারের প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে আসবে, যা পূর্বে অনিয়মিত কিংবা অসম্পূর্ণ ছিল।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য : আইনটি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়বদ্ধ থাকে এবং প্রতিটি অভিযোগ যথাযথভাবে বিচার প্রক্রিয়ায় আসে।

গুম বিচার, নতুন পথের প্রতিশ্রুতি : গুম আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত, তার আইনি স্বীকৃতি না থাকায় বহু পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তরা ন্যায়বিচারের বাইরে রয়ে গিয়েছিলেন। এই সংশোধনী এখন সেই ন্যায়বিচারের পথকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছে।

পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত ও নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া : যদিও সরকারি পক্ষ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার গ্রুপ, সাংবাদিক ও বিভিন্ন গবেষকরা ইতোমধ্যেই বলছেন- এটি একটি প্রয়োজনীয় কিন্তু দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ মাত্র। লিজা নমে একজন সচেতন নাগরিক বলেন, ‘আইন পাস হওয়া স্বাগত, কিন্তু বাস্তবায়ন ও বিচারের নিরপেক্ষতা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।’

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও পর্যবেক্ষণ : এটি উল্লেখযোগ্য যে, এই আইন সংশোধনী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের দায়বদ্ধতা ও মানবাধিকারগত অবস্থানকে নতুনভাবে দৃঢ় করতে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বহু বছর ধরেই বাংলাদেশে গুম ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এই সংশোধনী আইন সেই উদ্বেগের মোকাবিলা করার একটি স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

সর্বোপরি, জাতীয় সংসদে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’ পাস হওয়া একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত যা গুমের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের ন্যায়বিচার কাঠামোতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই সংশোধনী শুধুমাত্র আইনের একটি টেক্সট নয়; এটি জনগণের আস্থা অর্জন ও ন্যায়বিচারের জন্য সরকারের দায়বদ্ধতার একটি প্রতীক।

যদিও বাস্তবায়নের পথে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, ভারতের মতো বিভিন্ন দেশ এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আইনি কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশও যদি এই পথ ধরে চলে এবং প্রতিটি ঘটনার ন্যায়বিচার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে, তাহলে এটি দেশের আইনি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত হবে।