ঢাকার অপরাধ জগতে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে অনেক আগেই, কিন্তু এবারের আবিষ্কারটি খোদ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কপালে ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। সাধারণ একটি কলম, যা দিয়ে হয়তো কেউ ডায়েরি লিখছেন বা সই করছেন- মুহূর্তেই সেটি হয়ে উঠতে পারে একটি প্রাণঘাতী পিস্তল। রাজধানীর কোতোয়ালি থানা এলাকায় এক যুবদল কর্মীকে গুলি করার ঘটনায় উদ্ধার হওয়া এই ‘পেন গান’ বা ‘কলম পিস্তল’ এখন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত- একটি সাধারণ বিরোধ ও অভাবনীয় অস্ত্র : গত ৪ এপ্রিল রাজধানীর পুরান ঢাকার প্রসন্ন পোদ্দার লেনে চাঞ্চল্যকর এক হামলার শিকার হন রাসেল নামক এক যুবদল সদস্য। সাধারণ কোনো হাতাহাতি বা পরিচিত দেশি পিস্তলের ব্যবহার নয়, রাসেলের বুকে বিঁধেছিল এক বিশেষ ধরনের গুলি। অভিযোগ ওঠে, দোকান নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয়। হামলাকারী সায়মন ও তার সহযোগীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেলেও রাসেলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তদন্ত শুরু করতেই বেরিয়ে আসে বিস্ফোরক তথ্য। সায়মনকে গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়ে পেশাদার কিলার সোহেল ওরফে কাল্লু। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী কেরানীগঞ্জে এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে নামে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
সিগারেটের প্যাকেটে ছিল মৃত্যুর সরঞ্জাম : কেরানীগঞ্জে কাল্লুর গোপন আস্তানায় তল্লাশি চালিয়ে প্রথমে একটি ড্রয়ার থেকে কিছু সিগারেটের প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিতে প্যাকেটগুলো মামুলি মনে হলেও এর ভেতরেই ছিল মূল রহস্য। পলিথিনে মোড়ানো পাঁচটি ধাতব টুকরো উদ্ধার করেডিবি। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় সেই টুকরোগুলো যখন জোড়া লাগানো হয়, তখন দেখা যায় সেটি কোনো খেলনা নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ একটি ‘পেন গান’।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, এটি আসলে একটি অত্যাধুনিক এবং ইউনিক আগ্নেয়াস্ত্র। সাধারণ জনগণের ভিড়ে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশির মুখেও এটি শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। কারণ এটি পকেটে গুজে রাখলে মনে হবে একটি কলম মাত্র।
গুপ্ত ঘাতকের পছন্দ- কেন এই পেন গান : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাই-প্রোফাইল টার্গেট কিলার এবং সিক্রেট এজেন্টরা এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- ১. সহজ বহনযোগ্যতা: যে কোনো সাধারণ পকেটে এটি ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখা যায়। ২. শনাক্তকরণ কঠিন: মেটাল ডিটেক্টরেও অনেক সময় সাধারণ ধাতব কলম ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ৩. নিঃশব্দতা: সাধারণ পিস্তলের তুলনায় এর গুলির শব্দ অনেক কম হয়, যা জনাকীর্ণ এলাকায় অপরাধ ঘটিয়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘পেশাদার কিলার কাল্লু এই কলম পিস্তলটি মাত্র ৮০ হাজার টাকায় কিনেছিল। সে মূলত নজরদারির বাইরে থাকার জন্য এবং ছোট কিন্তু কার্যকর অপারেশনের জন্য এটি ব্যবহার করত।’
উৎস নিয়ে ধোঁয়াশা, প্রতিবেশী দেশ না কি অন্য কিছু : গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান লক্ষ্য এখন এই অস্ত্রের উৎস খুঁজে বের করা। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, এই ‘পেন গান’ প্রতিবেশী কোনো দেশ থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। তবে এটি কোনো আন্তর্জাতিক অস্ত্র চোরাচালান চক্রের অংশ কি না, তা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চলছে। পুলিশ আরও খতিয়ে দেখছে- কাল্লু এই অস্ত্র এর আগেও কোনো মিশনে ব্যবহার করেছে কি না, বাংলাদেশে আর কার কার কাছে এই ধরনের মরণঘাতী কলম রয়েছে, কুরিয়ার সার্ভিস বা বিশেষ কোনো রুটে এই আধুনিক অস্ত্রগুলো দেশে আনা হচ্ছে কি না?
অপরাধ জগতের বিবর্তন ও নিরাপত্তা ঝুঁকি : ঢাকার সন্ত্রাসীদের হাতে এই ধরনের গুপ্ত অস্ত্র পৌঁছে যাওয়াকে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সাধারণ অপরাধীরা যখন ‘পেন গান’-এর মতো বিশেষায়িত অস্ত্র ব্যবহার শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ভিআইপি নিরাপত্তা- সবই হুমকির মুখে পড়ে। ইতোমধ্যেই মাদকের বড় বড় চালান কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। এখন অস্ত্রের ক্ষেত্রেও যদি একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর হুঁশিয়ারি : ডিএমপি জানিয়েছে, এই ঘটনার সাথে জড়িত কাল্লুকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার নেটওয়ার্কে আর কারা আছে এবং এই অস্ত্রের ডিলার কারা, তাদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান। মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘যাদেরই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। এই মরণঘাতী কলম যাতে ঢাকার রাস্তায় আর কারও রক্ত ঝরাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।’
সর্বোপরি, ঢাকার অপরাধ মানচিত্র বদলে যাচ্ছে দ্রুত। সাধারণ দেশি পিস্তল বা শ্যুটার গানের জায়গা নিচ্ছে পেন গানের মতো আধুনিক গুপ্ত অস্ত্র। এই ‘কলম পিস্তল’ উদ্ধার হওয়ার পর এখন প্রশ্ন উঠেছে আপনার পাশের মানুষের পকেটে থাকা কলমটি কেবল লেখার যন্ত্র তো? না কি সেখানে লুকিয়ে আছে কোনো প্রাণঘাতী বুলেট? উত্তর খুঁজতে এখন গোয়েন্দাদের নিবিড় তদন্তের দিকে তাকিয়ে আছে সাধারণ মানুষ।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন