ঢাকার রাজপথ যেন বিশৃঙ্খলার চারণভূমি

রুহেল হাশেমী প্রকাশিত: এপ্রিল ১৭, ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
ঢাকার রাজপথ যেন বিশৃঙ্খলার চারণভূমি

রাজধানী ঢাকা, যে শহরকে বলা হয় দেশের অর্থনীতির হূৎপিণ্ড। কিন্তু এই হূৎপিণ্ডের ধমনীগুলো আজ রুদ্ধপ্রায়। ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে, যার একটি বড় অংশ উচ্চহারে সরকারি কর (ট্যাক্স) এবং ভ্যাট প্রদান করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে। অথচ মুদ্রার উল্টো পিঠ অত্যন্ত ভয়াবহ। যারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে সরকারকে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব দিচ্ছেন, তারা আজ রাজপথে সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা।

অন্যদিকে, লাইসেন্সবিহীন, রুট পারমিটহীন এবং কর ফাঁকি দেয়া অবৈধ যানবাহনের দখলে চলে গেছে রাজধানীর প্রতিটি অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, সার্জেন্টদের তোয়াক্কা না করা এবং গায়ের জোরে রাস্তা দখল করে রাখা এখনকার নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র।

এই অরাজক পরিস্থিতির কারণে বৈধ মালিক ও চালকরা আজ দিশেহারা। তারা প্রশ্ন তুলেছেন- সরকারকে রাজস্ব দিয়ে যদি রাজপথে স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার না পাওয়া যায়, তবে এই বিশৃঙ্খলার শেষ কোথায়?

বৈধ মালিকদের ক্ষোভ- কর দিয়েও মিলছে না অধিকার : একটি ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক কবির উদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর সরকারকে মোটা অংকের ট্যাক্স-টোকেন ফি, ফিটনেস ফি এবং ভ্যাট দিই। একটি গাড়ি নামাতে গেলে এবং তা সচল রাখতে গেলে সরকারকে লাখ লাখ টাকা দিতে হয়। কিন্তু রাস্তায় নামলে মনে হয় আমরাই অপরাধী। যারা কোনো নিয়ম মানে না, যাদের কোনো বৈধ কাগজ নেই, তারা রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা জ্যামে আটকে থাকি, আর তারা উল্টো পথে এসে আমাদের পথ আগলে ধরে। সরকারের কঠোর সিদ্ধান্ত ছাড়া এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় নেই।’ কবির উদ্দিনের মতো হাজারো ব্যক্তিগত গাড়ি মালিক ও বাস মালিকদের একই অভিযোগ। তাদের মতে, রাজপথ এখন ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে চলছে। যারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তারাই প্রতিনিয়ত হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।

ড্রাইভারদের চোখে ‘ভাইরাসের’ মতো ছড়িয়ে পড়া অটোরিকশা : রাজধানীর একজন পেশাদার চালক সাইফুল ইসলাম। দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকার রাস্তায় স্টিয়ারিং হাতে লড়াই করছেন তিনি। সামপ্রতিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে এখন বিভিন্ন প্রকারের ইঞ্জিনচালিত অটোরিকশা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এরা ট্রাফিক পুলিশের কথা শোনে না, সার্জেন্টকে পরোয়া করে না। হুটহাট মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ে যাত্রী তোলে, আবার কোনো সিগন্যাল ছাড়াই মোড় ঘোরে। এদের কারণে বড় গাড়ি চালানো এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ সাইফুল ইসলামের এই মন্তব্য কেবল একজন চালকের ক্ষোভ নয়, বরং এটি রাজধানীর রূঢ় বাস্তবতা। এই ব্যাটারিচালিত বা অনিবন্ধিত ইঞ্জিনচালিত রিকশাগুলো এখন ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, যা আইনত নিষিদ্ধ। অথচ প্রশাসনের চোখের সামনেই তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।

অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি, রাজস্ব বঞ্চিত সরকার : অর্থনীতিবিদদের মতে, ঢাকা শহরের এই অরাজক ট্রাফিক ব্যবস্থা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। প্রথমত, লাখ লাখ যানবাহন যদি কর ও ভ্যাটের আওতায় না থাকে, তবে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, তীব্র যানজটের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য বছরে হাজার কোটি টাকা।

যদি করবিহীন এই গাড়িগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনা যেত এবং যথাযথ কর আদায় করা নিশ্চিত করা হতো, তবে দেশের অর্থনীতির চাকা আরও শক্তিশালী হতো। বৈধ মালিকদের দাবি, সরকার যদি কঠোর হয়ে এই অবৈধ যানগুলো থেকে কর             আদায় করতো অথবা এদের উচ্ছেদ করতো, তবে একদিকে যেমন যানজট কমতো, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতো বিপুল অর্থ।

ঢাকার ‘বিষফোঁড়া’ ও ট্রাফিক ব্যবস্থার ভেঙে পড়া চিত্র : রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। একদিকে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বা স্মার্ট সিটি গড়ার স্বপ্ন, অন্যদিকে রাস্তার মোড়ে মোড়ে অবৈধ যানের জটলা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই অবৈধ যানবাহনগুলো এখন ঢাকা শহরের ‘বিষফোঁড়া’হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশৃঙ্খলার প্রধান কারণগুলো হলো- আইন অমান্যের সংস্কৃতি: অবৈধ যানের চালকদের কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকে না, ফলে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে তাদের কোনো জ্ঞান বা শ্রদ্ধাবোধ নেই। প্রশাসনের শিথিলতা: অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু অসাধু মহলের ছত্রছায়ায় এসব যানবাহন দাপিয়ে বেড়ায়, যার ফলে ট্রাফিক পুলিশও অনেক সময় অসহায় বোধ করে। অবৈধ স্ট্যান্ড: প্রধান সড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এখন অবৈধ যানের স্ট্যান্ড তৈরি হয়েছে, যা যানজটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সমাধানের পথ কী : ভুক্তভোগী গাড়ি মালিক এবং সাধারণ নাগরিকরা এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে সরকারের কাছে কয়েকটি জরুরি দাবি জানিয়েছেন- ১. অবৈধ যান উচ্ছেদ: অবিলম্বে ঢাকার প্রধান সড়কগুলো থেকে ইঞ্জিনচালিত ও ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং নিবন্ধনহীন যানবাহন অপসারণ করতে হবে। ২. কঠোর আইন প্রয়োগ: ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। কর ফাঁকি দেয়া যানবাহনের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। ৩. কর ও ভ্যাটের আওতায় আনা: যে সব যানবাহন রাস্তায় চলছে, তাদের প্রত্যেকের যথাযথ নিবন্ধন ও কর নিশ্চিত করতে হবে। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আসবে। ৪. ডিজিটাল মনিটরিং: সিসিটিভি এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে পুলিশ সার্জেন্টের অনুপস্থিতিতেও আইন অমান্যকারীদের চিহ্নিত করা যায়।

এখনই সময় কঠোর হওয়ার : একটি আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে ঢাকা তার মর্যাদা হারাচ্ছে শুধুমাত্র এই পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলার কারণে। যারা আইন মেনে সরকারকে টাকা দিচ্ছেন, তারা যদি রাস্তায় সুযোগ না পান, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা কমে যাবে।

গাড়ি মালিক পক্ষ এবং সাধারণ চালকদের দাবি এখন একটাই- সরকার যেন আর কালক্ষেপণ না করে। ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য রাখতে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াতে রাজপথের এই ‘বিষফোঁড়া’ উপড়ে ফেলা জরুরি। সরকার যদি কঠোর হাতে এই অবৈধ বাহনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবেই ঢাকার রাজপথে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং বৈধ করদাতারা তাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরে পাবেন।

দেশের অর্থনীতির চাকা চাঙ্গা করতে এবং রাজধানীকে যানজটমুক্ত করতে সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি। তা না হলে, ভবিষ্যতে এই ঢাকা শহর বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে, যা কারোরই কাম্য নয়।