বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড়

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ১২:২৫ এএম
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড়

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি নিশ্চিত করতে এবং সংস্থাটির দেওয়া কঠোর শর্ত পূরণে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। যদিও বর্তমান সরকার আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু ক্রমবর্ধমান লোকসান ও দাতা গোষ্ঠীর চাপে সেই অবস্থানে অটল থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইতোমধ্যে হিসাব বিভাগ বিভিন্ন মাত্রায় দাম বাড়ালে সরকারের কত টাকা আয় হবে বা ভর্তুকি কমবে, তার গাণিতিক বিশ্লেষণ শুরু করেছে।

হিসাবের মারপ্যাঁচে বিদ্যুতের দাম : বিদ্যুৎ বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ-এর সাথে আসন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আগে একটি খসড়া হিসাব তৈরি করা হচ্ছে।

  • ১০ শতাংশের হিসাব: যদি বিদ্যুতের দাম ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়, তবে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আয় হবে, যা সরাসরি ভর্তুকির চাপ কমাবে।
  • ৫ শতাংশের হিসাব: ৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের পথ খুঁজছে সরকার।
  • গ্রাহকভিত্তিক বিশ্লেষণ: কোন শ্রেণির গ্রাহকের (আবাসিক, বাণিজ্যিক বা শিল্প) ওপর কতটুকু বোঝা চাপালে আয় সর্বোচ্চ হবে, সেই সূক্ষ্ম হিসাবও কষছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ওয়াশিংটন বৈঠক ও ঋণের কিস্তি : আগামী ১৩ এপ্রিল ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফ-এর সাথে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ১.৮৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয়টি নির্ভর করছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ‘সমন্বয়’ বা দাম বাড়ানোর পদক্ষেপের ওপর। আইএমএফ চায় সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি কমিয়ে আনুক, যা বর্তমানে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  • ভর্তুকির ভার ও পিডিবির লোকসান : বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) আর্থিক অবস্থা এখন শোচনীয় পর্যায়ে।
  • ক্রয় বনাম বিক্রয়: পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড়ে ১২ টাকা ৩৬ পয়সায় কিনে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করছে মাত্র ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়।
  • বিশাল লোকসান: গত বছর বিদ্যুৎ খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও পিডিবির নিট লোকসান ছিল ১৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছর এই লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
  • আইএমএফ-এর লক্ষ্যমাত্রা: শর্ত অনুযায়ী চলতি বছর ভর্তুকির পরিমাণ কমিয়ে ৩৭ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, যা দাম বাড়ানো ছাড়া প্রায় অসম্ভব।
  • জ্বালানি তেল ও গ্যাসের অগ্নিমূল্য : বিদ্যুতের পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম নিয়েও সরকার ত্রিমুখী চাপে রয়েছে।
  • ডিজেলের ভর্তুকি: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার ডিজেল ১৮০ টাকার বেশি দিয়ে কিনতে হলেও দেশে বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। এতে প্রতিদিন সরকারের ১৬৭ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।
  • এলএনজি সংকট: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজির দাম দ্বিগুণ হয়েছে। এক কার্গো এলএনজি কিনতে এখন ১,৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে, যা আগে ছিল ৫০০ কোটি টাকা। পেট্রোবাংলার হিসাব মতে, কেবল আগামী তিন মাসে এলএনজি আমদানিতে ১৫ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।

সরকারের দোটানা: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, ২০২৬ ও ২০২৭ সালে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না। জ্বালানিমন্ত্রীও একাধিকবার এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেও তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সমপ্রতি নাকচ করে দিয়েছেন। কিন্তু আইএমএফ-এর ৪.৭ বিলিয়ন (যা বর্তমানে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে) ডলারের ঋণের কিস্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ভর্তুকি কমানোর শর্তই এখন প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পেট্রোবাংলা ও বিদ্যুৎ বিভাগের বক্তব্য: পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খাতে প্রতি মাসে ৫ হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। তবে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো সবুজ সংকেত এখনো সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে পাওয়া যায়নি। সর্বোপরি, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা নাকি আইএমএফ-এর শর্ত মেনে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই কঠিন সমীকরণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। ওয়াশিংটন বৈঠকের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে, দেশের সাধারণ গ্রাহকদের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা খসবে নাকি সরকার ভর্তুকির পাহাড় মাথায় নিয়েই পথ চলবে।