খরতাপে কাবু জনজীবন

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ১২:০২ এএম
খরতাপে কাবু জনজীবন

প্রচণ্ড খরতাপে পুড়ছে দেশ, জনজীবনে নেমে এসেছে চরম নাভিশ্বাস। বৈশাখের তপ্ত দুপুরে সূর্যের প্রখরতা যেন আগুনের হলকা হয়ে ঝরছে রাজপথ থেকে শুরু করে নিভৃত পল্লি পর্যন্ত। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই তীব্র দাবদাহে স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিস্তৃত অঞ্চলে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে চলায় দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে।

বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকায় ভ্যাপসা গরমে শরীরে যে অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে, তা থেকে রেহাই মিলছে না ঘরে কিংবা বাইরে কোথাও। বৃষ্টির জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় থাকা মানুষের মনে এখন কেবল একটাই প্রশ্ন, কবে নামবে এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি? তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব; হাসপাতালগুলোয় বাড়ছে গরমজনিত রোগীর ভিড়।

প্রকৃতি যেন তার রুদ্রমূর্তি ধারণ করে কেড়ে নিয়েছে প্রশান্তির ছায়া। একদিকে পুড়ছে মাঠের ফসল, অন্যদিকে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। খরতাপের এই দহন কেবল শরীরের ক্লান্তি নয়, বরং সামগ্রিক জীবনযাত্রাকেই এক অনিশ্চিত অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রকৃতির এই বৈরী আচরণে সাধারণ মানুষ এখন শুধুই প্রকৃতির কৃপা আর প্রশান্তিময় শীতল হাওয়ার প্রার্থনায় দিন গুনছে।

১. রাজধানীর তাপমাত্রা ও বর্তমান চিত্র

গতকাল শুক্রবার সকালে দেয়া পূর্বাভাসে দেখা গেছে, ভোরের দিকেও স্বস্তি ছিল না নগরজীবনে।

  • ভোরের তাপমাত্রা: সকাল ৬টায় ঢাকার তাপমাত্রারেকর্ড করা হয়েছে ২৮.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
  • সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড: গত বৃহস্পতিবার ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আজ আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
  • আর্দ্রতার দাপট: বাতাসের আর্দ্রতা ৮৫ শতাংশ হওয়ার কারণে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে। শরীর থেকে অবিরাম ঘাম ঝরছে, যা নগরবাসীকে ক্লান্ত ও অসুস্থ করে তুলছে।

২. এলাকাভিত্তিক তাপপ্রবাহের সতর্কতা

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, কেবল ঢাকা নয়, দেশের বেশ কিছু জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।

  • তপ্ত অঞ্চলসমূহ: ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, রাঙামাটি, বান্দরবান ও পটুয়াখালী জেলাসহ পুরো খুলনা বিভাগ এখন আগুনের হলকায় পুড়ছে।

এদিকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আকাশ জুড়ে আজ সূর্যের প্রখর দহন আর ভ্যাপসা গরমে জনজীবন ওষ্ঠাগত। সাগরের কোলঘেঁষা এই শহরে আর্দ্রতার আধিক্য থাকায় অনুভূত তাপমাত্রা বা ‘হিট ইনডেক্স’ সাধারণের চেয়েও অনেক বেশি কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আজ চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তবে বাতাসের উচ্চ আর্দ্রতার কারণে তা শরীরের কাছে ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো তপ্ত অনুভূত হচ্ছে।

সকাল থেকেই মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য আর গুমোট আবহাওয়ায় নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছে কর্মজীবী মানুষের। বিশেষ করে বন্দর ও ইপিজেড এলাকার পোশাক শ্রমিক এবং রিকশাচালকদের জন্য এই খরতাপ যেন এক অগ্নিপরীক্ষা। আংশিক মেঘলা আকাশ থাকলেও বৃষ্টির দেখা নেই, বরং বাতাসের গতিবেগ কম থাকায় উত্তাপ যেন আটকে আছে নগরীর অলিতে-গলিতে। এমন পরিস্থিতিতে তীব্র পানিশূন্যতা ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নগরবাসীকে সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং প্রচুর পানি পানের পরামর্শ দিচ্ছেন। চট্টগ্রামের এই তপ্ত চৈত্র-বৈশাখের রুদ্ররূপ কবে শান্ত হবে, এখন সেই স্বস্তির বৃষ্টির প্রতীক্ষায় চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে বন্দরনগরীর বাসিন্দারা।

৩. বৃষ্টির সম্ভাবনা কোথায়

পুরো দেশ পুড়লেও তিন বিভাগে বৃষ্টির আশার বাণী শুনিয়েছে অধিদপ্তর। রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া বা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হতে পারে। তবে ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকায় আকাশ আংশিক মেঘলা থাকলেও আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

৪. নৌবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত

দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কায় বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রংপুর, ময়মনসিংহ এবং সিলেট জেলার ওপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এই তিন জেলার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

৫. জনজীবনে প্রভাব ও চিকিৎসকদের পরামর্শ

তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট চরমে পৌঁছেছে। রিকশাচালক ও দিনমজুররা রোদে টিকতে না পেরে গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছেন। চিকিৎসকরা এমন পরিস্থিতিতে বেশ কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:

  • পানি ও পানীয়: শরীর সতেজ রাখতে প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ পানি, ডাব বা স্যালাইন পান করতে হবে।
  • সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা: জরুরি কাজ ছাড়া বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদে না বের হওয়াই ভালো।
  • খাবার: এই গরমে রাস্তার ধারের পচা বা খোলা খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে।

সর্বোপরি, প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ আর লাগামহীন খরতাপ কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি যেন আমাদের পরিবেশগত সংকটের এক অশনিসংকেত। তপ্ত রোদে পুড়ে যাওয়া জনপদ আর শ্রমজীবী মানুষের ক্লান্ত মুখগুলো প্রমাণ করে যে, প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য আজ কতটা বিপন্ন।

এক পশলা বৃষ্টির জন্য হাহাকার করা তৃষ্ণার্ত ধরণী আজ শুধু প্রশান্তিই খুঁজছে না, বরং খুঁজছে মানুষের সচেতন প্রয়াস। তাপপ্রবাহের এই দহন থেকে সাময়িক মুক্তি হয়তো বৃষ্টির মাধ্যমে মিলবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পরিকল্পিত বনায়ন ও পরিবেশ রক্ষার কোনো বিকল্প নেই। খরতাপে কাবু এই জনজীবন আবারও শীতল ছায়া আর সজীবতায় ভরে উঠুক প্রকৃতির কাছে এখন এটাই পরম প্রার্থনা।