২০০৯ সালে দেশের উচ্চ আদালত ঢাকার চার নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যাকে রক্ষায় এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন। নির্দেশ ছিল নদী দখলমুক্ত করা, সীমানা নির্ধারণী পিলার স্থাপন এবং ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে পাড় সুরক্ষিত করা। কিন্তু গত ১৭ বছরেও সেই নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখেনি নগরবাসী। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আইনি লড়াই আর প্রভাবশালী দখলদারদের থাবায় ঢাকার এই চারটি নদী আজও অস্তিত্ব সংকটে।
১. সীমানা নির্ধারণের গোলকধাঁধায় বিআইডব্লিউটিএ : বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২২০ কিলোমিটার নদীপথের একটি বড় অংশ এখনো অরক্ষিত। প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের আওতায় ৭,১০০টি সীমানা পিলার স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে ৬,৩০০টির। অর্থাৎ, ১,০০০-এর বেশি পিলারের কাজ এখনো ঝুলে আছে।
কাজের বর্তমান চিত্র
- অসমাপ্ত এলাকা: প্রায় ৩২ কিলোমিটার এলাকায় এখনো কোনো সীমানা পিলার বসানো সম্ভব হয়নি।
- অরক্ষিত পাড়: ১৪৮ কিলোমিটার পাড় এখনো কোনো প্রতিরক্ষা দেয়াল ছাড়াই পড়ে আছে।
- জরিপ জটিলতা: বিআইডব্লিউটিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু জাফর মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ কবির জানান, পূর্বের জরিপে কিছু ত্রুটি থাকায় নতুন করে হিসাব মেলাতে হচ্ছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ বন্দর এলাকায় ১৩ শতাংশ কাজ এখনো বাকি।
২. উন্নয়নের পথে ‘আইনি ও ভূমি’ কাঁটা : ওয়াকওয়ে এবং সীমানা পিলার স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ। ফতুল্লা, গাবতলী, আমিনবাজার, রায়েরবাজার, কামরাঙ্গীরচর ও আশুলিয়া এলাকায় কাজ চললেও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে সংস্থাটিকে।
প্রকল্প পরিচালক জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাথে কিছু আন্তঃসংস্থা বিরোধ ছিল, যা নিরসনের চেষ্টা চলছে। তবে পুরো ২২০ কিলোমিটার জুড়ে নিরবচ্ছিন্ন ওয়াকওয়ে নির্মাণ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে খোদ কর্মকর্তাদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে।
৩. পরিবেশবাদীদের ক্ষোভ: ‘আদালত অবমাননার শামিল’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির সরকারের এই কচ্ছপগতির সমালোচনা করে একে আদালতের নির্দেশ অমান্য করার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
“সরকার তিনটি ক্ষেত্রে শোচনীয় ব্যর্থতা দেখিয়েছে। তারা সঠিক সীমানা নির্ধারণ করতে পারেনি, সব পিলার বসাতে পারেনি এবং যেখানে পিলার বসানো হয়েছে, সেখানেও নদী তীর দখলমুক্ত রাখতে পারেনি। নতুন সরকারের কাছে আমাদের দাবি-নদী রক্ষাকে যেন জাতীয় অগ্রাধিকার ঘোষণা করা হয়।’ আলমগীর কবির, সাধারণ সম্পাদক, বাপা।
৪. ব্যয় বাড়ছে, কাজ ঝুলে আছে : ২০১৮ সালে অনুমোদিত প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যয় ৮৪৮ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ইতোমধ্যে ১,২৭৬ কোটি টাকা করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী ৯১ শতাংশ কাজ শেষ হলেও এর সুফল দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে কেরানীগঞ্জ, পাগলা, ডেমরা ও পূর্বাচল সংলগ্ন ১৪৮ কিলোমিটার এলাকার জন্য প্রস্তাবিত ‘তৃতীয় পর্যায়’ এখনো অনিশ্চিত। বিশ্বব্যাংকের একটি বড় বিনিয়োগ কর্মসূচির অধীনে এই কাজ হওয়ার কথা থাকলেও তাতে কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে বিআইডব্লিউটিএ এখন নতুন করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
৫. শুধু সীমানা নয়, বড় চ্যালেঞ্জ দূষণ : জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুর এ চৌধুরী মনে করেন, শুধু সীমানা রক্ষা করলেই নদী বাঁচবে না। আদালত এই নদীগুলোকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করলেও দূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর তৎপরতা একেবারেই যথেষ্ট নয়। শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ার কারণে নদীগুলো এখন আক্ষরিক অর্থেই বর্জ্যর ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
সর্বোপরি, ঢাকার চার নদী কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি এই মেগাসিটির পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার মূল চাবিকাঠি। দীর্ঘ ১৭ বছরেও যখন একটি মৌলিক নির্দেশ বাস্তবায়ন হয় না, তখন এর দায়ভার রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ওপরই বর্তায়। আমলাতান্ত্রিক ফাইল আর আইনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে দ্রুত নদীগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা এক বসবাসের অযোগ্য মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন