সাইবার জগতে ব্ল্যাকমেইল সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১২:১৭ এএম
সাইবার জগতে ব্ল্যাকমেইল সিন্ডিকেট

রাজধানীর সাইবার অপরাধের মানচিত্রে এক নতুন ও ভয়াবহ অধ্যায় উন্মোচিত হলো। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েদের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও টেলিগ্রামের মাধ্যমে বিক্রি করার অভিযোগে একটি সুসংগঠিত চক্রের পাঁচ হোতাকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গতকাল সোমবার দুপুরে কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই চক্রের হীন কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় ও অভিযান : র্যাব-৮ এর একটি বিশেষ দল ভোলা জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে এই চক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মেরাজুর রহমান আরমান, বিল্লাল হোসেন অন্তর, রবি আলম মমিন, আল আমিন ইসলাম ও হাসিব। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা এই অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

কনটেন্ট সংগ্রহের বিচিত্র উৎস— প্রেম থেকে হ্যাকিং : র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, এই চক্রটি মূলত চারটি উপায়ে তরুণীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করত। প্রাক্তন প্রেমিকাদের সঙ্গে সম্পর্কের বিচ্ছেদের (ব্রেকআপ) পর প্রতিশোধ নিতে অনেক সময় প্রাক্তন প্রেমিকরা তরুণীদের গোপন ছবি বা ভিডিও এই চক্রের কাছে হস্তান্তর করত। ডিভাইস ও  ফিশিং লিঙ্কের মাধ্যমে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন হ্যাক করে তারা গ্যালারিতে থাকা ব্যক্তিগত ছবি হাতিয়ে নিত। পারিবারিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে পরিচিত কেউ গোপনে ভিডিও বা ছবি তুলে এই চক্রকে সরবরাহ করত। সামাজিক মাধ্যম স্ক্র্যাপিং অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়ায় অসতর্কভাবে আপলোড করা ছবি ডাউনলোড করে তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মাধ্যমে বিকৃত করার অভিযোগও খতিয়ে দেখছে  র্যাব।

টেলিগ্রামের ‘প্রাইভেট চ্যানেল’ ও বিক্রির কৌশল : চক্রটি তাদের এই অন্ধকার ব্যবসা পরিচালনার জন্য টেলিগ্রাম অ্যাপকে বেছে নিয়েছিল। এখানে তারা একাধিক ‘প্রাইভেট চ্যানেল’ তৈরি করত। এই চ্যানেলগুলোয় যুক্ত হতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে গ্রহণ করা হতো। কনটেন্টের ধরন এবং গুরুত্ব বুঝে বিভিন্ন ধাপে অর্থ দাবি করা হতো। অনেক সময় তারা সরাসরি ভুক্তভোগী কিশোরীদেরও ব্ল্যাকমেইল করত এবং অর্থ না দিলে ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিত।

র্যাবের তদন্ত ও সতর্কবার্তা : সম্প্রতি গণমাধ্যমে টেলিগ্রামভিত্তিক সাইবার ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা উঠে এলে র্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। ডিজিটাল ফরেনসিক অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে চক্রটিকে শনাক্ত করা হয়। উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘এই চক্রটি দেশের শত শত তরুণীর জীবন বিষিয়ে তুলছিল। তাদের সংগৃহীত বিশাল ডাটাবেজ থেকে অনেক সংবেদনশীল তথ্য জব্দ করা হয়েছে।’ তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নজর রাখা এবং ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

আইনগত ব্যবস্থা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত : গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেলিগ্রাম বা এই ধরনের এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে অপরাধীরা নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা এখন অনেক বেড়েছে। তবে এ ধরনের অপরাধ রুখতে কেবল আইনি ব্যবস্থা নয়, বরং সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রচার প্রয়োজন। সর্বোপরি, এই চক্রের গ্রেপ্তার হওয়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এলেও সাইবার জগতের নিরাপত্তা নিয়ে বড় এক প্রশ্ন রেখে গেছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নারীর সম্মান নিয়ে ব্যবসা করা এই চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এখন সময়ের দাবি।