আজকের পৃথিবীতে চাকা ঘোরে তেলের ওপর ভর করে। কিন্তু এই তেলের যাত্রা শুরু হয়েছিল আমেরিকার পেনসিলভানিয়ার এক নিভৃত পল্লী থেকে। সেনেকা আদিবাসীদের ‘ভেষজ ওষুধ’ থেকে শুরু করে জন ডি রকফেলারের একচেটিয়া সাম্রাজ্য তেলের এই প্রথম যুগের পরতে পরতে মিশে আছে উদ্ভাবন, লোভ, উত্থান এবং পতনের শিহরণ জাগানিয়া গল্প।
টাইটাসভিল— আধুনিক সভ্যতার জন্মস্থান : ১৮৫৯ সালের আগে পৃথিবী ছিল মূলত তিমির তেলের ওপর নির্ভরশীল। তিমি শিকার করে পাওয়া তেল দিয়ে ধনীদের ঘরের বাতি জ্বলত। কিন্তু তিমির সংখ্যা কমে আসায় বিকল্প জ্বালানির খোঁজ শুরু হয়। ১৮৫৪ সালে পরীক্ষায় দেখা যায়, পেনসিলভানিয়ার মাটির নিচে জমে থাকা ‘রক অয়েল’ থেকে উন্নত মানের কেরোসিন তৈরি সম্ভব। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে আসেন কর্নেল এডউইন ড্রেক। যদিও তিনি প্রকৃত কোনো সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না, কেবল ট্রেনের ফ্রি পাস ব্যবহারের জন্য এই নাম ব্যবহার করতেন। ১৮৫৯ সালের ২৮ আগস্ট, টাইটাসভিলে ড্রেক এবং তার সহযোগী আংকেল বিলি স্মিথ যখন ৬৯.৫ ফুট গভীরে খনন সম্পন্ন করেন, তখন পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বাণিজ্যিক তেলকূপের জন্ম হয়। ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারে সেই তেল বিক্রি শুরু হওয়ার মাধ্যমেই উন্মোচিত হয় এক নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত।
তেল-উন্মাদনা ও পিথোলের পতন : ড্রেকের সাফল্যের পর চারদিকে তেলজ্বর ছড়িয়ে পড়ে। রাতারাতি মানুষ ধনী হওয়ার আশায় পেনসিলভানিয়ায় ভিড় জমাতে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল পিথোল শহর। ১৮৬৫ সালে সেখানে তেল পাওয়ার খবরে মাত্র কয়েক মাসে একটি জাঁকজমকপূর্ণ শহর গড়ে ওঠে। কিন্তু তেলের খনি ফুরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাত্র ৫০০ দিনের মাথায় সেই শহরটি একটি ‘ভূতের শহরে’ পরিণত হয়। যে জমির দাম ছিল ২০ লাখ ডলার, কয়েক বছর পর তা নিলামে ওঠে মাত্র ৪ ডলারে। এই ঘটনাটি ছিল তেলের বাজারের অস্থিরতা ও অনিয়ন্ত্রিত লোভে পড়ে নিঃস্ব হওয়ার প্রথম বড় উদাহরণ।
জন ডি রকফেলার— তেলের সম্রাট : তেল যখন বিশৃঙ্খল এক ব্যবসা, তখন সেই খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে আবির্ভূত হন জন ডি রকফেলার। ১৮৬৩ সালে তিনি তেলের রিফাইনারি বা শোধন ব্যবসায় নামেন। তিনি বুঝেছিলেন, কেবল তেল তোলা নয়, তেল শোধন ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করাই আসল শক্তি। ১৮৭০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি। রকফেলারের রণকৌশল ছিল অত্যন্ত নির্মম ও দক্ষ। তিনি রেলপথ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে গোপন চুক্তি করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ব্যবসায় ধস নামাতেন। মাত্র ৯ বছরের মধ্যে আমেরিকার ৯০ শতাংশ তেল শোধন ক্ষমতা তার দখলে চলে আসে। তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম বিলিওনিয়ার। কিন্তু তার এই ‘একচেটিয়া’ রাজত্ব অনেকের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছিল।
আইডা টারবেল— এক কলম যোদ্ধার আঘাত : রকফেলারের সেই অভেদ্য দুর্গ ভেঙেছিলেন এক নারী সাংবাদিক আইডা টারবেল। আইডার বাবা ফ্রাঙ্কলিন টারবেল ছিলেন একজন সাধারণ স্বাধীন তেল ব্যবসায়ী, যিনি রকফেলারের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। আইডা বড় হয়েছিলেন সেই ধ্বংসের চিত্র দেখে।
১৯০২ থেকে ১৯০৪ সালের মধ্যে ‘ম্যাকক্লুরস’ ম্যাগাজিনে আইডা টারবেলের ১৯ কিস্তির ধারাবাহিক তদন্ত প্রতিবেদন স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের গোপন ষড়যন্ত্র ও নির্মমতা জনসমক্ষে নিয়ে আসে। এটি ছিল আধুনিক সাংবাদিকতার ইতিহাসে প্রথম বড় কোনো করপোরেট তদন্ত। তার এই লেখনী শেষ পর্যন্ত মার্কিন সুপ্রিম কোর্টকে বাধ্য করে ১৯১১ সালে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানিকে ভেঙে দিতে।
কেরোসিন থেকে পেট্রোল যুগের রূপান্তর : তেলের আদি যুগে এর প্রধান কাজ ছিল কেরোসিন হিসেবে ঘরের বাতি জ্বালানো। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে থমাস এডিসনের বৈদ্যুতিক বাতি কেরোসিনের বাজারকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ঠিক সেই মুহূর্তে ত্রাতা হিসেবে আসে মোটরগাড়ি। হেনরি ফোর্ডের ‘মডেল টি’ গাড়ি এবং অ্যাসেম্বলি লাইনের উদ্ভাবন গ্যাসোলিন বা পেট্রোলের চাহিদাকে আকাশচুম্বী করে তোলে। তেলশিল্প তখন ‘আলো জ্বালানোর যুগ’ থেকে ‘চলাচলের যুগে’ প্রবেশ করে। সর্বোপরি, তেলের এই বিষয় আমাদের শেখায় কীভাবে একটি সাধারণ খনিজ পদার্থ একটি পরিবারের ভাগ্য থেকে শুরু করে একটি দেশের আইন ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ভেঙে গেলেও এর উত্তরসূরি কোম্পানিগুলোই (এক্সন, শেভরন, মোবিলে) আজও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। রকফেলার তার জীবনের শেষ দিকে বিপুল সম্পদ দান করে ইয়েলো ফিভার নির্মূল এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছিলেন, যা তার বিতর্কিত জীবনের এক অন্য পিঠ। আজকের এই ভূ-রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট কিংবা আধুনিক গতির নেপথ্যে রয়েছে সেই ১৮৫৯ সালের টাইটাসভিলের ছোট্ট কূপটির নীরব অবদান।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন