দেশের জনস্বাস্থ্য খাত এখন এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। যে হাতগুলো একসময় ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া আর কালাজ্বর রুখতে মাঠ চষে বেড়াত, সেই হাতগুলো আজ রিক্ত, ক্ষুধার্ত এবং অপমানের ভারে নুয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) অচল হয়ে পড়ায় গত দুই বছর ধরে বেতনহীন অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন প্রায় ২৫ হাজার ৮৫১ জন দক্ষ কর্মী।
কেবল বেতন বন্ধ হওয়া নয়, এর ফলে কার্যত ধসে পড়েছে দেশের সংক্রামক রোগ নজরদারি ও প্রতিরোধের কেন্দ্রীয় কাঠামো। একদিকে অভিজ্ঞ জনবলের ‘অদৃশ্য বেকারত্ব’, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে মশা ও রোগবাহী পতঙ্গ দমনের কার্যক্রম বন্ধ থাকা- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক মহাবিপদ সংকেতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই অবহেলা আগামী কয়েক বছরে দেশে মহামারির নতুন এক প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারে।
বেতনহীন দুই বছর, এক মানবিক বিপর্যয়ের আখ্যান : ঢাকার মগবাজার থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সিডিসির এই বিশাল কর্মী বাহিনী। গত দুই বছর ধরে তাদের জীবনে কোনো মাসের শেষে বেতনের মেসেজ আসেনি।
ঋণের জালে পিষ্ট জীবন : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুড়িগ্রামের এক মাঠকর্মী জানান, ‘দুই বছর ধরে মানুষের কাছে হাত পেতে সংসার চালাচ্ছি। মুদি দোকানে বাকি দিতে পারি না বলে এখন অন্য রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরি। অথচ প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে অফিসে যাই, কোনো নতুন নির্দেশ এলো কি না দেখতে। কারণ এই কাজটা আমাদের নেশা হয়ে গিয়েছিল।’
অভিজ্ঞতার মৃত্যু : স্বাস্থ্য খাতের ৩৮টি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে একসময় ৪৫ হাজার ৭৩ জন কর্মী কাজ করতেন। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৪৯২ জনকে রাজস্ব খাতে নেয়া হলেও বাকি ২৫ হাজার ৮৫১ জন আজ নিপতিত হয়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। এই কর্মীরা শুধু কর্মচারী ছিলেন না, তারা ছিলেন দেশের ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’-এর চোখ ও কান। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, রক্তের নমুনা পরীক্ষা এবং টিকাদান কর্মসূচির মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তারা। তাদের এই নিষ্ক্রিয়তা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
কেন ভেঙে পড়ল কাঠামো : স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) অধীনে পরিচালিত অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপি হলো এমন একটি ইঞ্জিন, যা পুরো স্বাস্থ্য খাতকে সচল রাখে। ২০২৪ সালের জুনে চতুর্থ এইচপিএনএসপির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন ওপি কার্যকর না হওয়ায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনিক মেকানিজমের অনুপস্থিতি : একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করেন, প্রোগ্রাম বা পরিকল্পনা কাগজে আছে, কিন্তু তা মাঠপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো ‘রাস্তা’ বা প্রশাসনিক পথ নেই। ওপি বন্ধ থাকায় যে বিষয়গুলো অচল হয়ে পড়েছে— লজিস্টিক সরবরাহ: ল্যাবরেটরির রিএজেন্ট, ডায়াগনস্টিক কিট এবং ওষুধ কেনা বন্ধ হয়ে গেছে। তদারকি: জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নজরদারি কার্যক্রমের জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বন্ধ থাকায় মাঠ তদারকি শূন্যের কোঠায় নেমেছে। বকেয়া বেতন ও ভাতা: দীর্ঘমেয়াদি বেতন বন্ধ থাকায় কর্মীরা এখন জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় (যেমন- রিকশা চালানো বা দিনমজুরি) যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।
‘অদৃশ্য বেকারত্ব’ এবং দক্ষতার অপচয় : এই সংকটের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো ‘অদৃশ্য বেকারত্ব’। জেন্ডার বিশেষজ্ঞ মনজুন নাহারের মতে, এটি একটি কাঠামোগত অপরাধ। কর্মীদের আনুষ্ঠানিকভাবে ছাঁটাই করা হচ্ছে না, আবার কাজেও ফেরানো হচ্ছে না।
মরিচা ধরা ছুরির গল্প : সিডিসির একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা, যার ৫০টির বেশি আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ রয়েছে, তিনি তার বর্তমান অবস্থাকে ‘অব্যবহূত ধারালো ছুরির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘একটি ছুরি কাজ না করলে যেমন তাতে মরিচা পড়ে যায়, আমাদের দক্ষতাও তেমনি ক্ষয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি ডেঙ্গু কীভাবে রুখতে হয়, কিন্তু আমাদের হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে।’ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, এটি মানবসম্পদের চরম অপচয়। দক্ষ মানুষকে বসিয়ে রাখা মানে হলো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে ছিনিমিনি খেলা।
ভেক্টরবাহিত রোগের ঝুঁকি, দোরগোড়ায় মহামারি : ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর এবং যক্ষ্মার মতো রোগগুলো নজরদারি ছাড়া নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। গত দুই বছরে মাঠপর্যায়ে মশার লার্ভা জরিপ বা কালাজ্বরের রোগী শনাক্তকরণ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ।
আগামী ২-৫ বছরের পূর্বাভাস : বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিকতা অত্যন্ত জরুরি। একবার নজরদারি ব্যবস্থা ভেঙে গেলে রোগগুলো সংগোপনে বিস্তার লাভ করে এবং যখন তা ধরা পড়ে, তখন তা মহামারির রূপ নেয়। বর্তমান শূন্যতা আগামী কয়েক বছরে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব বা আউটব্রেক ঘটাতে পারে, যা সামাল দিতে তখন বর্তমানের চেয়ে ১০ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অর্জনে কলঙ্ক : বাংলাদেশ কালাজ্বর নির্মূলে যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে, নজরদারি বন্ধ থাকলে তা হারানো কেবল সময়ের ব্যাপার। যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা থেকেও দেশ ছিটকে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
উত্তরণের পথ- বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ : এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে জনস্বাস্থ্য খাতকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা— অন্তর্বর্তীকালীন ওপি চালু: নতুন ওপি চূড়ান্ত হতে দেরি হলে জরুরি ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো তৈরি করে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম শুরু করা। বকেয়া বেতন পরিশোধ: মানবিক ও আইনি দিক বিবেচনায় গত দুই বছরের বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ করে কর্মীদের কর্মস্পৃহা ফিরিয়ে আনা। দক্ষতা রক্ষা: অভিজ্ঞ কর্মীদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা যাতে তারা স্থায়ীভাবে জনস্বাস্থ্য সেবায় যুক্ত হতে পারেন। বিকল্প অর্থায়ন: দাতা সংস্থা বা নিজস্ব তহবিল থেকে জরুরি লজিস্টিক (কিট ও ওষুধ) কেনা নিশ্চিত করা।
উল্লেখ্য, একটি দেশের উন্নয়ন কেবল বড় বড় অবকাঠামোতে নয়, বরং তার মানুষের সুস্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে। সিডিসির এই ২৫ হাজার কর্মীকে বেতনহীন রেখে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে অচল করে দিয়ে আমরা কার্যত একটি রোগগ্রস্ত ভবিষ্যতের দিকে হাঁটছি। মানুষের প্রাণ বাঁচাতে যারা লড়াই করেন, আজ তারাই প্রাণের দায়ে ধুঁকছেন- এই পরিহাস বন্ধ হওয়া জরুরি। জনস্বাস্থ্য খাতের এই ভাঙন এখনই রোধ করা না গেলে, আগামী দিনে আমাদের প্রতিটি পরিবারকে এর চড়া মাশুল দিতে হবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন