ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ১, ২০২৬, ১২:৪৬ এএম
ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাত

মুখথুবড়ে পড়েছে ২৬টি রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। ফলে দেশের স্বাস্থ্য খাতে রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হওয়ায় স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। ফলে বর্তমানে সংক্রামক ও অসংক্রামক মিলিয়ে অন্তত ২৬টি রোগ দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা তা আরো বাড়বে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ১১টি রোগের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু টিকার সংকট দেখা দেয়ায় ব্যাহত হয় দেশে টিকাদান কর্মসূচি। তাছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার ১৫টি রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বন্ধ করায় এখন তৈরি হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি। স্বাস্থ্য খাত এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বিভিন্ন বয়সে শিশুদের মোট ৭টি টিকা দেয়া হয়। তার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা হয় ১১ ধরনের রোগ। যক্ষ্মার মতো ভয়াবহ ব্যাধি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দেয়া হচ্ছে বিসিজি (বিসিজি) টিকা। তাছাড়া রয়েছে পেন্টাভ্যালেন্ট বা পেন্টা টিকা, যা একাই পাঁচটি রোগ প্রতিরোধে সক্ষম।

সেটি শিশুদের ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস (হুপিং কাশি), ধনুষ্টংকার, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি এবং হেপাটাইটিস-বি থেকে সুরক্ষা দেয়। পোলিও নির্মূলে দুই ধরনের টিকা ব্যবহার করা হয়। তার মধ্যে রয়েছে মুখে খাওয়ার জন্য ওপিভি এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে আইপিভি।

তাছাড়া শিশুদের নিউমোনিয়া থেকে বাঁচাতে দেয়া হয় পিসিভি টিকা। হাম ও রুবেলার মতো সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে এমআর টিকা কার্যকরী ভূমিকা রাখে। তাছাড়া টাইফয়েড প্রতিরোধে শিশুদের দেয়া হয় টিসিভি টিকা। আর রোটাভাইরাসজনিত ডায়রিয়া প্রতিরোধে ওনার  ভ্যাকসিন দেয়া হয়।

কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অব্যবস্থাপনায় গত বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাহত হয়েছে সবগুলো টিকা প্রদানের কার্যক্রম। ফলে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে ২৬টি রোগের ঝুঁকি।

সূত্র জানায়, দেশে ১৯৯৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় পরিচালিত হয়ে আসছে রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম। বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে ওই কর্মসূচি বাস্তবায়ন হতো এবং এর আওতায় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ, গবেষণাসহ মোট ৩৮টি কর্মসূচি পরিচালিত হয়।

সরকারি অর্থায়ন ও দাতা সংস্থার সহায়তায় পাঁচ বছর পরপর ওই কর্মসূচি নবায়ন করা হতো। বিগত ২০২৪ সালের জুন মাসে শেষ হয় চতুর্থ এইচপিএনএসপি। আর জুলাইয়ে এক লাখ ছয় হাজার ১০০ কোটি টাকার পাঁচ বছরের জন্য পঞ্চম এইচপিএনএসপি শুরু হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের মার্চে হঠাৎ করে ওপি বন্ধ করে দেয়। তাতে দেশের রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়। আর তার প্রভাব পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পড়ছে।

সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে দেশে হাম ও রুবেলা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, হেপাটাইটিস, রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া), গর্ভকালীন জটিলতা, কালাজ্বর, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, নারী ও প্রসূতি রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, কৃমি, রাতকানা, টাইফয়েড, পোলিও, এইচআইভি, ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস, ধনুষ্টংকার, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, চর্মরোগ, মানিসক স্বাস্থ্য সমস্যা, অন্ধত্বসহ ২৬টি রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ওপি বন্ধ করায় মুখথুবড়ে পড়েছে। দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে ওপি বন্ধ হওয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ফলে অনেক শিশুই নির্ধারিত সময়ে টিকার পূর্ণ বা আংশিক ডোজ পায়নি। তাতে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়নি। আর ওপি বন্ধ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত বর্তমান সরকার নতুন করে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) প্রণয়ন করতে পারেনি।

এদিকে স্বাস্থ্য খাতের ৩৮টি রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে একসময় ৪৫ হাজার ৭৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হওয়ার পর তাদের বড় অংশই অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বর্তমানে সরকার ১৯ হাজার ৪৯২ জনকে রাজস্ব খাতে নিয়ে বেতন দিচ্ছে। কিন্তু বাকি ২৫ হাজার ৮৫১ কর্মীর বেতন বন্ধ রয়েছে গত দুই বছর ধরে। বিদ্যমান এই জনবলকে বাইরে রেখে এরই মধ্যে বর্তমান সরকার নতুন করে নিয়োগের পরিকল্পনা করছে।

অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো জরিপ বা গবেষণা না করেই বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ওপি বাতিল করেছে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ সংকট স্বাস্থ্যকে অনেক দিন ভোগাবে। এখন সরকার নতুন কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানান, সরকার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে নতুন করে ডিপিপি বা ওপি দ্রুত প্রস্ততের ব্যবস্থা করছে। এরই মধ্যে আরো যক্ষ্মা পরীক্ষা কিট ও ওষুধের সরবরাহ ঠিক রাখতে জরুরি বৈঠক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।