রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার এক চরম প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকার প্রধান তিনটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সায়দাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী। বর্তমানে এই টার্মিনালগুলোর অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একে বাস রাখার নির্দিষ্ট স্থান বলার চেয়ে ‘বাসের ভাগাড়’ বলাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই তিনটি টার্মিনালের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা মাত্র ১ হাজার ২৫০টি বাসের হলেও বাস্তবে সেখানে প্রতিদিন অবস্থান করছে ৪ হাজার ৫০০-এরও বেশি বাস। অর্থাৎ, সক্ষমতার চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি বাসের চাপে পিষ্ট হচ্ছে টার্মিনালগুলো।
ভেতরে জায়গা না থাকায় বাসগুলো অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরছে প্রধান সড়ককে। টার্মিনাল সংলগ্ন রাস্তাগুলোর বেশিরভাগ বাসের দখলে থাকায় রাজধানীজুড়ে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী ও অসহনীয় যানজট। যত্রতত্র পার্কিং আর রাস্তার ওপর থেকে যাত্রী ওঠানামার প্রতিযোগিতায় পুরো এলাকা যেন এক একটি নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে। এই তীব্র বিশৃঙ্খলা নিরসনে সরকার এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে।
ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ বাসের রুট পারমিট বাতিল এবং টার্মিনালগুলোকে শহরের প্রান্তসীমায় স্থানান্তরের মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এবার পুরনো ও ফিটনেসবিহীন বাসের রুট পারমিট বাতিলসহ টার্মিনাল স্থানান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঢাকার বুক থেকে যানজটের এই বিষফোঁড়া সরাতে শহরমুখী পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
ধারণক্ষমতা বনাম বাস্তবতার করুণ চিত্র : সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং ডিএনসিসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার তিনটি টার্মিনালের চিত্র ভয়াবহ- গাবতলী টার্মিনাল: ধারণক্ষমতা মাত্র ২৫০টি বাস, কিন্তু চলাচল করছে ৮০০ থেকে ১০০০টি। এখান থেকে মূলত উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাস ছাড়ে।
মহাখালী টার্মিনাল: ৩৫০টি বাসের জায়গায় প্রতিদিন যাতায়াত করছে১২০০টি বাস। এটি ঢাকার ঠিক মাঝখানে হওয়ায় পুরো শহরের যানজটে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে। সায়েদাবাদ টার্মিনাল: ধারণক্ষমতা ৬৫০টি বাস, কিন্তু বর্তমানে চলাচল করছে ২ হাজার ২০০টি। চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলের বাসের চাপে সায়েদাবাদ ও আশপাশের সড়ক প্রায় স্থবির থাকে।
সড়কের ওপর ‘অবৈধ’ স্ট্যান্ড, বাড়ছে ঝুঁকি : টার্মিনালের ভেতরে জায়গা না থাকায় অধিকাংশ বাস মূল সড়কের ওপর পার্কিং করা হচ্ছে। যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় সড়কের ওপরই বসানো হয়েছে অসংখ্য কাউন্টার। ফলে যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কের মাঝখান থেকে বাসে উঠতে হচ্ছে। এতে সড়কের বড় অংশ বেদখল হয়ে যাওয়ায় রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে সারাক্ষণই যানজট লেগে থাকছে।
সরকারের কঠোর পদক্ষেপ- রুট পারমিট বাতিল : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, টার্মিনালে বাসের সংখ্যা ধারণসীমার মধ্যে আনতে পর্যায়ক্রমে অতিরিক্ত বাস সরিয়ে দেয়া হবে। তিনি বলেন, ‘বিআরটিএ ও পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। যেসব বাসের অর্থনৈতিক আয়ু শেষ হয়ে গেছে এবং যাদের ফিটনেস বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক নেই, তাদের রুট পারমিট সরাসরি বাতিল করা হবে।’
টার্মিনাল স্থানান্তর ও বিকেন্দ্রীকরণ পরিকল্পনা : বর্তমান সরকার ঢাকার তীব্র যানজট নিরসনে আন্তঃজেলা টার্মিনালগুলোকে শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্থানান্তর: মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল শহর থেকে বাইরে সরিয়ে নেয়া হবে।
নতুন টার্মিনাল: সায়েদাবাদের ওপর চাপ কমাতে কাঁচপুরে নির্মাণাধীন আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। সিটি সার্ভিস: গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়া সংলগ্ন এলাকায় কেবল সিটি বাস সার্ভিসের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিআরটিসি ডিপো: ফুলবাড়িয়া থেকে বিআরটিসি বাস ডিপো কমলাপুরে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মালিক সমিতির সমর্থন ও শঙ্কা : বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলমও স্বীকার করেছেন যে, ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বাস থাকায় সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। তবে মালিকদের দাবি, কেবল রুট পারমিট বাতিল নয়, ঢাকার বাইরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত টার্মিনালগুলো দ্রুত প্রস্তুত করতে হবে, যাতে পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীরা হয়রানির শিকার না হন।
পরিশেষে বলা যায়, ঢাকার প্রবেশপথগুলোকে সচল রাখতে এবং নগরবাসীর যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে টার্মিনালগুলোর এই জরাজীর্ণ দশা ও বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটানো জরুরি। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বাসের ভিড় টার্মিনালগুলোকে যে ‘বাসের ভাগাড়ে’ পরিণত করেছে, তা কেবল যানজটই বাড়াচ্ছে না, বরং রাজধানীর সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থাকেই পঙ্গু করে দিচ্ছে।
সরকার কর্তৃক ফিটনেসবিহীন বাসের রুট পারমিট বাতিল এবং আন্তঃজেলা টার্মিনালগুলোকে শহরের প্রান্তসীমায় স্থানান্তরের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তার সফল বাস্তবায়নই হতে পারে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান। কেবল নীতিগত সিদ্ধান্ত বা আশ্বাস নয়, বরং আধুনিক ও পরিকল্পিত পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমেই ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য ও গতিশীল মেগাসিটি হিসেবে পুনর্গঠন করা সম্ভব। অন্যথায়, সড়কের ওপর বাসের এই বিশৃঙ্খল পাহাড় ভবিষ্যতে জনভোগান্তিকে আরও চরম সীমায় নিয়ে যাবে।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন