ভুল পদক্ষেপ ও হামের মহামারি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ৪, ২০২৬, ১২:৩৪ এএম
ভুল পদক্ষেপ ও হামের মহামারি

বাংলাদেশে চলমান হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবকে একটি ‘মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’। তাদের প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে সাময়িকীটি দাবি করেছে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া টিকা সংগ্রহ সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণেই দেশে আজ এই মহামারি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমলাতান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে দেশের শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে এখন পর্যন্ত ২৫০ জনেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

দুর্ঘটনার নেপথ্যে ইউনূস সরকারের ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ নীতি : ‘সায়েন্স’ জার্নালের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি জীবনরক্ষাকারী টিকা সংগ্রহ করা হতো। এই পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকার পাশাপাশি টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এই পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ পদ্ধতি চালু করে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা মূল কারণসমূহ সতর্কবার্তা উপেক্ষা: ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বারবার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন যে, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি থেকে সরে গেলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটবে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা আমলে নেয়া হয়নি। জটিল আমলাতন্ত্র: উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিটি জটিল প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে আটকে যায়। ফলে সঠিক সময়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে টিকার কার্যাদেশ দেয়া সম্ভব হয়নি। টিকা সংকট: এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশজুড়ে টিকার বাফার স্টক শেষ হয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি স্থবির হয়ে পড়ে।

প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহ চিত্র শয্যা নেই হাসপাতালে : চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে হামের এই প্রাদুর্ভাব চরম আকার ধারণ করে। প্রতিবেদনে ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালের একটি করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, শয্যা সংকটের কারণে শত শত শিশুকে হাসপাতালের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। সংক্রমণ: সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা ৩২ হাজার ছাড়িয়েছে। বিস্তার: দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই হাম ছড়িয়ে পড়েছে। মৃত্যু: এখন পর্যন্ত ২৫০ জনেরও বেশি প্রাণহানি ঘটেছে, যাদের সিংহভাগই শিশু।

কাঠামোগত দুর্বলতা ও অপুষ্টির প্রভাব : আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর এবং উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেনের মতে, এই সংকটের মূলে কেবল টিকার অভাব নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাও দায়ী। অপুষ্টি: দেশের প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির এবং ১০ শতাংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

ভিটামিন ‘এ’ সংকট: ২০২৪ সালের পর তিনটি ভিটামিন ‘এ’ বিতরণ কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে হামের সংক্রমণকে প্রাণঘাতী করে তুলেছে। রোহিঙ্গা শিবির: জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন শরণার্থী শিবিরে প্রথম সংক্রমণ শুরু হয় এবং সেখান থেকেই তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক বিতর্ক : গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা নেয়ার পর নতুন সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। পুরোনো পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন: এপ্রিল মাস থেকে আবারো ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা সংগ্রহ শুরু হয়েছে। জরুরি টিকাদান: ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান ও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক দায়ভার: সম্প্রতি সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংকটের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও তার আগের সরকারের অব্যবস্থাপনা উভয়কেই দায়ী করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সায়েদুর রহমান মানবিক ক্ষতির কথা স্বীকার করে বলেন, আইনি কাঠামোর পরিবর্তনের কারণেই তখন ক্রয় পদ্ধতিতে বদল আনা হয়েছিল, তবে তার পরিণাম যে এত ভয়াবহ হবে তা অপ্রত্যাশিত ছিল।

সর্বোপরি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে, তাতে বর্তমান টিকাদান কর্মসূচির গতি দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাদুর্ভাব থামানো কঠিন হবে। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

হাম উপসর্গে আরো ১০ শিশুর মৃত্যু : দেশে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা) আরো ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর বাকি ৯ শিশু হামের উপসর্গে ভুগছিল।

গতকাল রোববার প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, নতুন এই মৃত্যুগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে, যা পরিস্থিতির ব্যাপকতা ও ঝুঁকির মাত্রা আরো স্পষ্ট করছে। মৃত শিশুদের মধ্যে ঢাকায় ৪ জন, বরিশাল অঞ্চলে ২, চট্টগ্রামে ১, খুলনায় ১ এবং সিলেটে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাম শনাক্ত হওয়া শিশুটি রাজধানী ঢাকাতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৪ জনে।

এর মধ্যে ৫০ শিশুর শরীরে ল্যাবরেটরিতে হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর ২৪৪ শিশু মারা গেছে শুধু উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১৬৬ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৪০ হাজার ৪৯১ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যাও কম নয়। এই সময়ের মধ্যে ২৭ হাজার ৮১৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। যদিও এর মধ্যে ২৪ হাজার ৯০ শিশু চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে, তবুও নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে টিকাবিহীন শিশুদের মধ্যে। তাই প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতাল-এও হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে, যেখানে অনেক শিশুকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সরকারের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। শিশুদের সময়মতো টিকা দেয়া, রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হামের প্রকোপ বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য খাতে জরুরি প্রস্তুতি নেয়ার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।