সড়ক শৃঙ্খলায় হচ্ছে আরএসপিএস

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ১১, ২০২৬, ১২:১৯ এএম
সড়ক শৃঙ্খলায় হচ্ছে আরএসপিএস

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে। চিরচেনা বিশৃঙ্খলা, আইন অমান্যের সংস্কৃতি এবং ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে চালকদের চিরস্থায়ী বাগবিতণ্ডার অবসান ঘটাতে সরকার চালু করতে যাচ্ছে ‘রোড সেফটি পেনাল্টি সিস্টেম’ (আরএসপিএস)।

এই অ্যাপসভিত্তিক ডিজিটাল ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো চালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা তৈরি করা এবং সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে এই আধুনিক প্রযুক্তি কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে জনমনে যেমন আশা আছে, তেমনি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে রয়েছে গভীর সংশয়।

আরএসপিএস ব্যবস্থার আদ্যোপান্ত : বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) উদ্ভাবিত এই ব্যবস্থায় প্রতিটি ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে নির্দি ষ্ট পরিমাণ ‘পয়েন্ট’ বরাদ্দ থাকবে। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর বিধান অনুযায়ী, প্রতিটি লাইসেন্সে থাকবে মোট ১২ পয়েন্ট।

চালক যখনই কোনো ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করবেন, তার লাইসেন্স থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পয়েন্ট কাটা যাবে। পয়েন্ট কাটার প্রক্রিয়া। ট্রাফিক পুলিশের হাতে থাকবে অত্যাধুনিক স্মার্ট ডিভাইস, আইন লঙ্ঘনের সাথে সাথে সার্জেন্ট তার ডিভাইসের মাধ্যমে অপরাধটি রেকর্ড করবেন, অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি বিআরটিএ-র কেন্দ্রীয় সার্ভারে তথ্য পৌঁছে যাবে এবং চালকের পয়েন্ট কমে যাবে, পয়েন্ট কমতে কমতে যখন শূন্যে পৌঁছাবে, তখন সংশ্লি ষ্ট চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সটি স্থায়ীভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে।

এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো স্বচ্ছতা। এখানে ট্রাফিক পুলিশের ব্যক্তিগত বিবেচনার সুযোগ কমে আসবে এবং চালকদের হয়রানির অভিযোগও হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ডিএমপির সার্জেন্ট আব্দুর রহিম রোমন জানান, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে মামলা দিতে গিয়ে আমাদের চালকদের সাথে অনেক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ডিজিটাল সিস্টেমে সব রেকর্ড থাকবে, ফলে হ্যারাসমেন্ট বা তর্কের সুযোগ থাকবে না।’

বিশৃঙ্খল সড়কের রূঢ় বাস্তবতা : রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারা দেশের সড়কগুলোর বর্তমান চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিনিয়ত উল্টো পথে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র পার্কিং এবং বেপরোয়া গতির কারণে সড়ক আজ মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ চালক কোনো না কোনোভাবে নিয়মিত ট্রাফিক আইন অমান্য করছেন।

সড়ক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, ‘সড়কের মূল সমস্যা বা ‘রুট কজ’ সমাধান না করে শুধু ডিজিটাল অ্যাপ দিয়ে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন। বর্তমানে অধিকাংশ গণপরিবহন চলে ‘ট্রিপ’ ভিত্তিক চুক্তিতে। চালকদের নির্দি ষ্ট কোনো বেতন নেই। বেশি ট্রিপ মানে বেশি আয়্তএই মানসিকতাই তাদের বেপরোয়া করে তোলে।’

চালকদের পক্ষ থেকেও একই সুর শোনা যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাস চালক বলেন, ‘আমরা পেটের দায়ে গাড়ি চালাই। মালিককে নির্দি ষ্ট টাকা জমা দেয়ার পর যা থাকে তা দিয়ে সংসার চলে। যাত্রী যেখানে নামতে চায় সেখানেই নামাতে হয়, না হলে তারা ঝামেলা করে। যদি আমাদের মাসিক বেতনের ব্যবস্থা করা হতো এবং নির্দি ষ্ট স্টপেজ নিশ্চিত করা হতো, তবে আইন মানা আমাদের জন্য সহজ হতো।’

চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবায়নের পথরেখা : বিআরটিএ জানিয়েছে, আরএসপিএস ধাপে ধাপে সারাদেশে কার্যকর করা হবে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে- প্রযুক্তিগত অবকাঠামো: সারা দেশের ট্রাফিক পুলিশকে স্মার্ট ডিভাইস প্রদান এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা। দুর্নীতি রোধ: ডিজিটাল সিস্টেমেও যেন কোনো অসাধু উপায়ে পয়েন্ট পুনঃস্থাপনের সুযোগ না থাকে, তা নিশ্চিত করা।

জনসচেতনতা: কেবল চালক নয়, সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদেরও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলা। যত্রতত্র রাস্তা পারাপার এবং যেখানে সেখানে গাড়ি থামানোর আবদার বন্ধ করা। পরিবহন খাতের সংস্কার: চুক্তিভিত্তিক বাস চলাচল বন্ধ করে কোম্পানিভিত্তিক এবং বেতনভুক্ত চালক নিয়োগের ব্যবস্থা করা।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ : বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দিয়ে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। পর্যাপ্ত জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভার ব্রিজ এবং গণপরিবহনের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে।

এছাড়া, লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে যাতে অদক্ষ চালক সড়কে নামতে না পারে। সর্বোপরি, ডিজিটাল পেনাল্টি সিস্টেম বা আরএসপিএস নিঃসন্দেহে একটি আধুনিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় এই পয়েন্ট সিস্টেম অত্যন্ত কার্যকর। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর সাফল্য নির্ভর করবে কঠোর নজরদারি এবং পরিবহন খাতের সার্বিক সংস্কারের ওপর।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সড়কের রক্তক্ষরণ থামবে কি না, তা দেখার জন্য আমাদের আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে। সরকারের এই সদিচ্ছা যদি মাঠ পর্যায়ে সঠিক বাস্তবায়নের মুখ দেখে, তবেই নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।